সি-সেকশনের মধ্যে দিয়ে যাওয়া মায়েদের প্রসঙ্গে যে তিনটে কথা জোর গলায় বলা দরকার।

লেখিকা ঃ মনেট নিকোল

এই লেখাটা সেই সব মায়েদের জন্য যাদের সন্তানের জন্ম সি-সেকশনের মাধ্যমে হয়েছে। সি-সেকশনের মাধ্যমে জন্ম খুব সহজ একটা ব্যাপার, এই অদ্ভুত ধারণাকে সমূলে উপড়ে ফেলা প্রয়োজন। 

আমি পেশায় একজন বার্থ ফটোগ্রাফার, এবং সেই পেশাগত কারণেই অনেক পরিবারের খুব নিবিড় মুহূর্তগুলো ক্যামেরা বন্দী করার জন্যে আমায় তাঁদের অন্দরমহলে প্রবেশ করতে হয়।  লেবার রুমে ঢুকে একজন শিশুর জন্মের প্রতিটি ছোট বড় মুহূর্তকে ধরে রাখার চেষ্টা  করি আমি। বাবা মায়েদের জন্য তাঁদের সন্তানের জন্মের মুহূর্তটাকে গল্পের মত করে সাজিয়ে তুলতে সাহায্য করাটাই আমার কাজ; তাঁদের ভয়, চিন্তা, উত্তেজনা, ব্যথা, যন্ত্রণা, আশঙ্কা, উচ্ছ্বাস, জমে থাকা ভালোবাসা – সবটুকু। আর এই প্রতিটা গল্পই ভীষণ সুন্দর, খুব মন কেমন করা। 

কিন্তু কর্মক্ষেত্রেই আমি দেখেছি যে আজও নর্মাল ডেলিভারিই মানুষের চোখে আদর্শ জন্ম পদ্ধতি, সি-সেকশনের নামে আজও কারুর কারুর ভুরু কুঁচকে ওঠে। সার্জারিটা যেন ঠিক কালো ছায়ার মত, ভ্যাজিনাল বার্থই যেন সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার শ্রেষ্ঠ উপায়। 

গতকাল রাত্রেই একটা অদ্ভুত সুন্দর ঘটনার কথা জানতে পারলাম। আচমকাই বাথটাবে এক সন্তানের জন্ম দেন এক মা। সেই সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন শুধুই তাঁর স্বামী। ঘরে বসে তাঁরা দু’জনেই এই অপার্থিব অনুভূতি ভাগ করে নেন, উষ্ণতায় জড়িয়ে রাখেন তাঁদের নবজাতককে। ঘটনাটা এতটাই অনন্যসাধারণ যে শুনতে সবারই ভালো লাগবে। গত ফেব্রুয়ারিতে আমি একটা ফুটলিং ব্রীচ বার্থের (Footling Breach Birth) ছবি তুলেছিলাম। সি-সেকশনের সমস্ত আয়োজন যখন প্রস্তুত তখন আচমকা পরিস্থিতি পালটে যায় এবং অপারেশন টেবিলেই শিশু গর্ভ থেকে বেরিয়ে আসে, তবে সবার আগে বেরিয়ে আসা শিশুর পা। এমন একটা দুর্দান্ত ঘটনা, সকলের ভালো লাগবেই। 

কিন্তু আমার বার বার খালি মনে হয়ে অনেক মায়ের অবিশ্বাস্য যুদ্ধ আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়। এমন কত সন্তানপ্রসবের গল্প আছে যেগুলো আমাদের চোখে পড়ে না অথচ সেগুলোতেও মিশে রয়েছে কত স্বপ্ন, সংগ্রাম, কষ্ট আর ভালোবাসা। সেগুলো নিয়েও চমৎকার গল্প হতে পারে। আমি সেই মায়েদের কথা বলছি যারা সিজারিয়ান পদ্ধতিতে সন্তানের জন্ম দিয়েছেন; তাঁদের সন্তান প্রসবেও থাকে আলোড়ন, সৌন্দর্য ও অস্বাভাবিক রকমের মনের জোরের । 

তাই আমি বারবার বলি; সি-সেকশনের মধ্যে দিয়ে যাওয়া মায়েদের সন্তান প্রসবের অভিজ্ঞতাও কম রোমাঞ্চকর বা কম সুন্দর নয়। সেই সব মায়েদের সন্তান প্রসবের কাহিনীগুলোও ভুলে গেলে চলবে না। 

১। সি-সেকশনের মধ্যে দিয়ে যাওয়া মায়েরা অত্যন্ত সাহসী।

সি-সেকশনের জন্য নিজেকে মানসিক ভাবে তৈরি করাটা আদৌ ছেলেখেলা নয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অপারেশন থিয়েটারের ভিতরে হবু বাবাকে ঢুকতে দেওয়া হয় না, বা বড় জোড় তাঁকে ডেকে নেওয়া হয় এপিডিউরাল দেওয়ার পরে যখন সমস্ত প্রস্তুতি সারা। আর তার মানে যখন অপারেশন থিয়েটারে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ডাক্তার বা নার্সেরা ছোটাছুটি করে চলেছেন, নিজেদের মধ্যে গপ্পগুজ্জব করে চলেছেন (সিনেমা, খাওয়াদাওয়া বা আর পাঁচটা সাধারণ বিষয়ে); তখন সেই প্রেগন্যান্ট নিঃসঙ্গ মহিলাটি স্থির হয়ে অপেক্ষা করছেন সেই সুবিশাল অথচ অচেনা মুহূর্তের। একলা, নিরুপায় অথচ কী ভীষণ সাহসী অপারেশন টেবিলে বসে থাকা সেই মানুষটি, তাই না? 

সার্জারিটা নেহাত ছোটখাটোও নয়। আর এই সময় মায়েরা নিজের মনকে শক্ত করে বেঁধে রাখতে পারেন শুধুমাত্র তাঁর মাতৃস্নেহ দিয়ে। সমস্ত ভয়, আশঙ্কা, দুশ্চিন্তা হেলায় সরিয়ে দিয়ে তিনি এত বড় একটা অপারেশনের মুখোমুখি হতে পারেন শুধু মাত্র নিজের সন্তানের মঙ্গল কামনা করে। প্রত্যেক মা জানেন যে সি-সেকশন অপারেশন মানেই খুব বড় শারীরিক ক্ষত বহন করা; এমন ক্ষত যা সম্পূর্ণ ভাবে সারতে সময় লাগে অনেক। অথচ এ’গুলো জেনেও মায়েরা হাসি মুখে সি –সেকশনের দিকে এগিয়ে যান স্রেফ নিজের সন্তানের মুখ চেয়ে। মায়েরা বুঝতে পারেন যে নয় মাস ধরে গড়ে তোলা নর্মাল ডেলিভারির স্বপ্ন-মুহূর্ত থেকে তিনি বঞ্চিত হতে চলেছেন। কিন্তু ওই যে বললাম, সন্তান স্নেহে সব কিছুই করা সম্ভব।

আপনি মা হয়েছেন নর্মাল ডেলিভারির মধ্যে দিয়ে? বেশ ভালো। কিন্তু পাশাপাশি যে মায়েদের সি-সেকশন হয়েছে তাঁদের কথাও একটু ভেবে দেখুন। ভেবে দেখুন কী অসম্ভব তাঁদের মনের জোর। নিজেকে ওঁর জায়গায় রেখে ভাবুন অপারেশন টেবিলে বসে সেই অপেক্ষা কী ভয়ানক অথচ কী সহজে এ সমস্ত কিছু সহ্য করে তিনি নির্ভীক ভাবে সি-সেকশনের দিকে এগিয়ে যান।  আপনি আমার সঙ্গে নিশ্চিত ভাবেই এক মত হবেন; সি-সেকশন হওয়া মায়েরা সত্যিই সাহসী।

২। সি-সেকশনের মধ্যে দিয়ে যাওয়া মায়েদের প্রাণশক্তি অফুরন্ত।

মা হওয়ার সুখবর পাওয়া মাত্রই কেউ সি-সেকশনের কথা ভাবেন না এবং সে’টাই স্বাভাবিক। সাধারণত মেডিকাল এমার্জেন্সিতেই সি-সেকশনের দরকার পড়ে। কখনও কখনও অবশ্য ভুল ডাক্তারির জন্যেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। অনেকে সি-সেকশনের আগে মানসিক প্রস্তুতির জন্য সপ্তাহ খানেক সময় পান। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ব্যাপারটা ঘটে আচমকা; মাত্র কয়েকদিন সময় পাওয়া যায়। কখনও বা মাত্র কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক মিনিট সময় পাওয়া যায় সি-সেকশনের আগে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে পালটে যায় সমস্ত পরিকল্পনা। নিখুঁত ভাবে ছকে রাখা সমস্ত স্বপ্ন ওলটপালট হয়ে গিয়ে সামনে পড়ে থাকে সার্জারির হাতছানি। অনেক সময় মায়েরা জানতেও পারেন না যে ঠিক কতটা অপেক্ষার পর নিজের সন্তানকে জড়িয়ে ধরতে পারবেন তিনি।

আচমকা ধেয়ে আসা পরিবর্তনকে মেনে নেওয়া সহজ নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও মায়েরা সি-সেকশন মেনে নিতে পারেন প্রবল মনের জোরে ভর দিয়ে আর নিজের গর্ভের সন্তানকে ভালোবেসে।

আর এরপর ঘটে সেই সার্জারি। কাটাছেঁড়া এবং সেলাই। অন্তত মাস খানেক সময় লাগে এই অপারেশনের পর সম্পূর্ণ ভাবে সুস্থ হয়ে উঠতে। আর বড় কোন সার্জারির পর সবাই যে’খানে সম্পূর্ণ ভাবে বিশ্রামে এবং আরামে থাকতে চায় বেশ কিছু দিন, সি-সেকশনের পর মায়েদের ঠিক উলটো দিকে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়। কারণ তখন তাঁর কাঁধে থাকে তাঁর নবজাতক সন্তানকে সামলানোর গুরুদায়িত্ব।

মানসিক এবং শারীরিক ভাবে সি-সেকশন হওয়া মায়েরা অত্যন্ত দৃঢ়। আর  ডেলিভারির পরেও বহুদিন  এই দৃঢ়তার প্রয়োজন; কারণ এত বড় সার্জারির পর শরীর এবং মনকে সম্পূর্ণ ভাবে সুস্থ করে তোলা আদৌ সহজ কাজ নয়। বিশেষত যখন দায়িত্ব থাকে নিজের সন্তানের প্রথম দিনগুলোতে তাকে সামলে রাখার।  মাতৃত্বের স্নেহ আর শারীরিক সংগ্রাম মিলেমিশে এ সময়টা যে কোনও সি-সেকশন হওয়া মায়ের জন্যই ভীষণ চ্যালেঞ্জিং।

৩। সি-সেকশনের মধ্যে দিয়ে যাওয়া মায়েরা সত্যিই অপরূপা।

মাতৃত্ব লাভ করতে হলেও বিভিন্ন আঘাত চিহ্ন বরণ করে নিতেই হয়; কিছু চিহ্ন থাকে মনে, কিছু শরীরে। সি-সেকশন মায়েদের দু’রকম আঘাতই বরণ করে নিতে হয়। কিন্তু এই আঘাতগুলোই মায়েদের দুর্দান্ত মানসিক ও শারীরিক যুদ্ধের সাক্ষ্য বহন করে, যে যুদ্ধজয় না করলে তাঁর সন্তানের জন্ম সম্ভব হত না।

এই আঘাতগুলোই তাঁর সন্তানের জন্মলগ্নের চির-অমলিন স্মৃতি।

মাতৃত্বের এই বিভিন্ন আঘাত চিহ্ন আমায় বিভিন্ন ভাবে আপ্লুত করে,  তাঁদের রকমফের, দৈর্ঘ্য; সবকিছু। প্রত্যেকটা আঘাত অন্যরকম, প্রত্যেকটা আঘাতে নিজস্ব চরিত্র ও গল্প থাকে। প্রতিটা আঘাত চিহ্নই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আপনা থেকেই বদলে যায়, আবছা হয়ে আসে, শুকিয়ে আসে; এই গল্পগুলোও আমার কাছে রূপকথার মত মনে হয়। প্রত্যেকটা ক্ষত চিহ্নই সুন্দর, প্রত্যেকটা ক্ষত চিহ্নতেই প্রাণের স্পন্দন লুকিয়ে আছে।

সি-সেকশনের মধ্যে দিয়ে যাওয়া মায়েদের ছোট না করে, আমাদের সবার উচিৎ তাঁদের সাহায্য করা যা’তে তাঁরা নিজেদের আঘাত ও ভালোবাসার গল্পগুলো নিয়ে এগিয়ে আসতে পারেন।

Translated by Tanmay Mukherjee

loader