প্রথম সন্তানের জন্মের সময় যে তিনটে বিষয়ে আপনার প্রস্তুত থাকা উচিৎ

প্রেগন্যান্ট হওয়ার সুখবরটা পাওয়ার পর থেকেই আপনার জীবনে নেমে আসে উপদেশের ঝড়। আর সে ঝড় বেশ মজাদার, সে’খানে বিজ্ঞান ভক্ত দাদাভাইটি থেকে শুচিবায়ুগ্রস্ত জেঠিমা পর্যন্ত সবাই আপনাকে বলবে “এ’বার তোমার জীবন আমূল পালটে যাবে”। আসলে কিন্তু আদৌ তেমন সমূলে পালটে যায় না সব কিছু, বদল ঠিক ততটাই হয় যতটা আপনি বদলে যেতে চান। তার বেশি কিছু নয়।

বিশেষত একজন নারীর ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন গুলো শুধু তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, পরিবর্তন আসে তার শরীর এবং মনেও। এই পালটে যাওয়াগুলো বেশ বিস্তৃত এবং আমাদের সামাজিক আচার-ব্যবস্থা সে’সব বদলের পরিপ্রেক্ষিতেই তৈরি হয়েছে। কিন্তু তিনটে এমন বিষয় রয়েছে যা নিয়ে বড় একটা আলোচনা শোনা যায় না। এই লেখাটা সেই তিনটে বিষয় নিয়ে কথা বলার জন্যেই।

১। ঘরের পরিবেশ ও পরিসর

বাড়ি-ঘরদোর পালটে যাবেই; আগের মত করে আর কিছুতেই গুছিয়ে রাখতে পারবেন না, সে আপনার ঘরে যতই ভালো পরিচারিকা থাকুন না কেন বা আপনার বাড়িটি যতই দুর্দান্ত হোক না কেন। আমি এমনিতে যথেষ্ট খুঁতখুঁতে; টেবিলে আজেবাজে জিনিসপত্র রাখা চলবে না, সোফা ঠিক পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রী অ্যাঙ্গেলে থাকতে হবে, কারপেট মেঝের বাইরে দেওয়াল ঘেঁষে উঠে থাকবে না…এইসব। বুঝতেই পারছেন ব্যাপারটা। কিন্তু সন্তানের জন্মের পর, বিশ্বাস করুন; ঘর গুছিয়ে রাখার ফুরসৎটুকুই আর পাওয়া যায় না।

শিশু অন্য ঘরে শুলেও, নিশ্চিন্ত থাকুন যে শিশুর জিনিসপত্রে আপনার শোওয়ার ঘর ভরে যাবে। একমাত্র আপনার রান্নাঘরে বোধ হয় তেমন ভাবে পালটে যাবে না; যদি না রান্নার সমস্ত ভার আপনার উপরই থাকে। সে ক্ষেত্রে আপনার পরিষ্কার নিয়ে খুঁতখুঁত হয়ত একটু কমিয়ে ফেলতে হবে কারণ নিয়মিত রান্নাঘর সাফ করার সময়টুকু হয়ত আপনার কাছে থাকবে না। শুধু তাই নয়, আপনার ব্যালকনিও শিশুর ভেজা জামা কাপড় শুকোনোর জন্য রিজার্ভ করা থাকবে। ড্রয়িং রুমে যাওয়ার বিশেষ সময় সুযোগ আপনি পাবেন না কারণ আপনার দিনের বেশির ভাগ সময়টাই কেটে যাবে শিশুর পরিচর্যায়।

গোটা বাড়িতে ছড়িয়ে পড়বে একটা নতুন সুবাস, আপনার গায়েও থাকবে একটা অন্য সুগন্ধ। ঘরের আলো বা শীততাপ ব্যবস্থা শিশুর প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত হবে।

অতএব অনেক কিছুই পালটে যাবে এবং আপনাকে অনেক বদলের জন্যেই প্রস্তুত থাকতে হবে। এমন ভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে যা’তে পরিবর্তনগুলো আপনাকে বিব্রত না করতে পারে।

২। পয়সাকড়ি

এ’টা একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হবু বাবা-মা বা তাঁদের পরিবার সাধারণত হাসপাতালের খরচটুকুর বাইরে বিশেষভাবে কোনও খরচের পরিকল্পনা আগে থেকে করে রাখে না। আমার ইচ্ছে করে তাঁদের জোর করে বলি “শুনে রাখো, বাচ্চা হওয়ার পর হাসপাতালের খরচটুকু বাদেও অনেক রকম খরচা থাকবে। কাজেই টাকাপয়সার হিসেবপত্তর অনেক আগে থেকে করে রাখা ভালো, নয়তো আদত সময়ে বিপদে পড়তে হবে।

যেমন ধরুন শিশুর জন্মের ছ’মাসের মাথায় আপনার বেবিফুডের খরচ বেশ চড়া হবে। কাজেই এই বেলা ভেবে রাখুন যে আপনি কেনা বেবিফুড খাওয়াবেন শিশুকে না ঘরোয়া খাবার খাওয়াবেন না দু’টোই মিলিয়ে মিশিয়ে। এ’ই হিসেব আগে থেকে কষে রাখলে পরে সমস্যা কম হবে।

প্রথম কয়েক মাসের মূল খরচ বলতে ডাক্তারের ফীজ, ওষুধপত্র, লন্ড্রি আর ডাইপার। কাপড়ের ডাইপারে কাজ চালাতে চাইলে দেখবেন ওয়াশিং মেশিনের পিছনে বিস্তর খরচ হচ্ছে কারণ ইলেক্ট্রিসিটি বিলের চড়চড় করে বেড়ে যাওয়া আর ওয়াশিংপাউডারের বাড়তি খরচ। রাত্রে শিশুর জন্য ডিসপোসেবল ডাইপার ব্যবহার করাই সমীচীন হবে এবং আজকাল বহু বাবা মা এমনটাই করছেন। এবং আমার মতে এ’টাই বুদ্ধিমানের কাজ কারণ দিনের বেলা আপনি শিশুকে চোখে চোখে রাখতে পারবেন এবং কাপড়ের ন্যাপি ভিজে গেলেই তৎক্ষণাৎ পালটে দিতে পারবেন। কিন্তু রাতের দিকে একটা এক্সট্রা স্মল ডাইপারই আপনার শিশুর জন্য যথেষ্ট। আর প্রথম মাসখানেক পাইকারি হারে ডাইপার কিনে রাখাটা বুদ্ধিমানের কাজ।

ভারতে বাবা-মায়েরা গড়ে মাসে ৯০০ টাকা থেকে ১৪০০ টাকা পর্যন্ত ডাইপারে খরচ করেন (দিনে তিনটে ডাইপারের হিসেবে) সদ্যজাতের জন্য এবং খরচটা ক্রমশ বেড়ে যায় যখন শিশুরা বড় হয় আর সম্পূর্ণ ভাবে ডিসপোজেবল ডাইপার ব্যবহার করা শুরু করে। হসপিটালে থাকার সময়ই কয়েকটা ব্র্যান্ডের ডাইপার কিনে ফেলুন ট্রায়াল হিসেবে এবং দেখুন কোনটা আপনার শিশুর জন্য সব চেয়ে ভালো। আর একটা সদুপদেশ রইল; সস্তা ডাইপারের দিকে ঝুঁকবেন না।

ভালো ডাইপার একজন শিশু আর তার মায়ের জন্য রীতিমত আশীর্বাদ। আর যেহেতু বছর দুয়েক আপনাকে চলতে হবে ডিসপোজেবল ডাইপারের ভরসায়, সেহেতু একটা ভালো ব্র্যান্ড বেছে সে’টাই একটানা ব্যবহার করে যাওয়া ভালো। সে’জন্য মাসে একটা খরচ বরাদ্দ করে রাখাটাও দরকারি। টাকাপয়সার সুব্যবস্থা থাকলে বাবামায়ের অর্ধেক চিন্তা দূর হয়ে যায়।

৩।  একাগ্রতা এবং মনঃসংযোগ

এ’টা হয়ত কেউই আলাদা করে বলে দেবে না কিন্তু প্রত্যেক বাবা মায়ের জন্য এ’টা জরুরী। আপনার নিজের ওপর মনোযোগ ও একাগ্রতা কমে আসতে বাধ্য; অন্তত শিশুর বছর দুয়েক বয়স পর্যন্ত। কারণ এ সময়টা আপনার মন সর্বক্ষণ পড়ে থাকবে আপনার শিশুর দিকে, ওর যাবতীয় প্রয়োজনের দিকে। এ সময়টা আপনি হয়তো কোনও বইয়ে মন বসাতে পারবেন না, টিভি খুলেও ধৈর্য ধরে দেখতে ইচ্ছে করবে না। তবে তা’তে চিন্তার কিছু নেই। জেনে রাখুন সে’টা একদম স্বাভাবিক।

আমার সবসময় মনে হত যে আমার প্রথম শিশুর জন্মের আগে কেউ যদি এ’টা আমায় বলে দিত তাহলে অন্তত আমি নিজের অমনোযোগী ব্যবহার নিয়ে এত চিন্তিত হয়ে উঠতাম না। হয়ত আরও একটু ধৈর্য ধরে নিজেকে প্রস্তুত করতাম নতুন পরিস্থিতির জন্য। তবে এ’টাও বলে রাখি যে বেবি-বুকে স্মৃতি জমা করার জন্য এ’টাই সেরা সময়। এ সময় হয়ত আপনার মনে হচ্ছে যে আপনি আপনার শিশুর বড় হওয়ার সমস্ত ধাপ মনে রাখতে পারছেন কিন্তু কিছু বছর পর আপনার আচমকা খেয়াল হবে যে শিশুর পাঁচ মাস বয়সের স্মৃতি আর আপনার মনে নেই। তখন অনুতাপের শেষ থাকবে না।

কাজেই এই শুরুর দিকগুলোই হচ্ছে বেবিবুক বা বেবিজার্নাল রাখার আদর্শ সময়। ফোনেও রেকর্ড রাখা যায় শিশুর বড় হয়ে ওঠার প্রতিটি মুহূর্ত। আর এর মধ্যে দিয়ে নিজের একাগ্রতাও ফিরে পাওয়া সম্ভব।

আর শেষে একটা জরুরী পরামর্শটা। ঘর এলোমেলো হয়ে যাওয়ার দোষ নিজের ঘাড়ে নেবেন না যেন। টাকাপয়সার খরচের হিসেব ঠিক রাখুন। মনঃসংযোগ এ’দিক ও’দিক হলে বিচলিত হবেন না। বরং শিশুর জন্মের পর জীবনে নেমে আসা পরিবর্তনগুলোকে মন দিয়ে উপভোগ করুন। কেমন? শুভেচ্ছা রইলো।

Translated by Tanmay Mukherjee

loader