শিশুর জন্মের পর কতদিন লাগে মায়ের শরীর সম্পূর্ণ ভাবে সুস্থ হতে? জানলে অবাক হতেই হবে

“আমার শিশুর জন্মের এক মাসের মধ্যে আমি অফিস জয়েন করেছি”, এমনটা আকছার শোনাই যায়। অথচ ধরুন আপনি বাড়িতে বসে আছেন, ডেলিভারির পর মাস খানেক কেটে গেছে কিন্তু আপনার কিছুতেই ইচ্ছে হচ্ছে না নিজের কাজের জগতে ফিরে যেতে।

এর কারণগুলো স্পষ্ট। ডেলিভারির পর শারীরিক ভাবে সুস্থ হয়ে ওঠাটাই একমাত্র চ্যালেঞ্জ নয়; মানসিক ধাক্কা সামাল দিয়ে ওঠাটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ

ধাপ। অনেক মায়েরাই শিশুর জন্মের পর বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়েন (সে’টাকে ডাক্তারি ভাষায় বলা হয় পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন)। এর ফলে শরীরে আসে অবসাদ আরে মনে থাকে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা এবং এই অবস্থা চলতে পারে সন্তানলাভের পর ছয় থেকে সাত মাস পর্যন্ত। মায়ের মানসিক সুস্থতার গুরুত্ব অনুধাবন করাটা অত্যন্ত জরুরী আর এ’টা শুধু কথার কথা নয়, প্রমাণিত সত্যও বটে।

ইংল্যান্ডের স্যালফোর্ড ইউনিভার্সিটির প্রফেসরদের মতে শিশুর জন্মের পর মাত্র ছ’সপ্তাহের বিশ্রাম কিছুতেই যথেষ্ট নয়। সম্পূর্ণ সুস্থ হতে একজন

মায়ের এক বছর পর্যন্তও প্রয়োজন হতে পারে। অনেক সেলিব্রেটি মায়েদের দেখা যায় যে তাঁরা শিশুর জন্মের পর যেন ফুসমন্তরে চটজলদি সুস্থ হয়ে উঠেছেন এবং সে’টা দেখে আর পাঁচজনে মনে করে আমরাও তেমনটাই পারব না কেন।

সেই রিসার্চ টিমের অন্যতম সদস্য ডাক্তার জুলী রে এ বিষয়ে অনেক মায়ের সাক্ষাৎকার নিয়ে একটা ব্যাপার স্পষ্ট বুঝতে পারেন; সন্তানের জন্মের পর মাত্র ছ’সপ্তাহের ছুটি একজন মায়ের সুস্থ হওয়ার জন্য একান্তই অপর্যাপ্ত। গবেষণার সময় অনেক মা জুলীকে জানান যে দু’মাসের মধ্যে কাজে ফেরায় কী প্রবল ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে তাঁদের। আসলে সন্তানের জন্মের ষাট দিন পরেও নারী দেহ আর মন ‘ট্রমা’র বোঝা বয়ে বেড়ায়, তার থেকে নিষ্কৃতি পেতে দরকার আরও সময়।

আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ডাক্তার জুলীর নজরে পড়ে; ডেলিভারির পর মায়েদের হসপিটালে বিশ্রাম নেওয়ার সময়টুকু আজকাল বেশ কমে এসেছে। আজকাল অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে ডেলিভারির ঘণ্টা ছয়েকের মধ্যেই মা ও শিশু হসপিটাল ছেড়ে বেরিয়ে আসছেন। তাছাড়া যে’টুকু সময় মায়েরা হসপিটালে রয়েছেন, শুভাকাঙ্ক্ষীদের ভিড় আর হাসপাতালের আইনকানুনের সঙ্গে তাল মিলিয়েই কেটে যায়, মায়েদের নিশ্চিন্তে নিজের খোকা বা খুকুকে নিয়ে বিশ্রামটুকু আর নেওয়া হয় না।

ডাক্তার জুলীর মতে যে’টা প্রবল ভাবে জরুরী সে’টা হচ্ছে ডেলিভারির পর শিশু ও মায়ের আরও ভালো দেখভালের সুব্যবস্থা এবং আরও লম্বা বিশ্রামের সুযোগ।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান ইউনিভার্সিটির ডাক্তার জ্যানিস এম মিলারও একই বিষয়ে গবেষণা করেছেন। তার গবেষণার জন্য তিনি বেছে নিয়েছিলেন ৬৮জন অন্তঃসত্ত্বা নারী যাঁরা সকলের ওপরেই ছিল ‘হাই রিস্ক প্রেগন্যান্সি’র কালো মেঘ। সে’খানেও দেখা গেল একই ব্যাপার। ডেলিভারির পরেও একটানা অনেকদিন মায়েরা বিভিন্ন শারীরিক দুর্ভোগে রয়েছেন যেমন ; পিঠের ব্যথা, পেরিনিয়ামে যন্ত্রণা, ইউরিনারি ইনকন্টিনেন্স এবং এনাল টিয়ার। এই সমস্ত শারীরিক দুর্ভোগ কাটিয়ে সুস্থ হতে একজন মায়ের বেশি কিছু মাস সময় লেগে যেতে পারে।

ডেলিভারির পরের সুস্থ জীবনে ফিরে যাওয়াটা একটা চ্যালেঞ্জ এবং শারীরিক সুস্থতার সঙ্গে যে’টা জড়িয়ে থাকে সে’টা হল মানসিক সুস্থতা। শিশুর জন্মের মাস ছ’সাত পরেও অনেক মা অবসাদ, উদ্বেগ এবং মানসিক ক্লান্তিতে ভোগেন। বিজ্ঞান বলছে যে মানসিক ভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ না হলে কিছুতেই শারীরিক ভাবে পুরোপুরি সুস্থ হওয়া সম্ভব নয়।

বর্তমানে যে’টা সবচেয়ে দরকারি সে’টা হল কিছু নিয়মকানুন বদলের দিকে জোর দেওয়ার যা’তে মায়েরা শিশুর জন্মের পর একটু সুযোগ পান নিজেদের মত করে সুস্থ হয়ে ওঠার। ম্যাটারনিটি লীভ বা শিশুর জন্মের পরে মায়েদের ছুটির মেয়াদ বাড়ানোটা অত্যন্ত জরুরী। এ’তে মায়েরা নিজের সন্তানের জীবনের প্রথম দিনগুলো মনেপ্রাণে উপভোগ করতে পারবেন এবং নিজেরাও সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য  যথেষ্ট সময় পাবেন। এ’ছাড়া হাসপাতালগুলোর উচিৎ মায়েদের যত্নের সঙ্গে হাত ধরে প্রথম পদক্ষেপগুলোয় সাহায্য করা; যে’মন ব্রেস্টফীড করতে শেখানো বা স্নান করতে শেখানো।

মা হওয়ার সত্যিই মুখের কথা নয়; শরীর এবং মন – দুইয়ের ওপর দিয়েই বিস্তর ধকল যায়। কাজেই আমাদের নিয়মকানুন এবং হাসপাতালগুলোর উন্নতি ঘটিয়ে মায়েদের আরও একটু যত্ন করার ব্যবস্থা করতেই পারি; এ’টুকু অন্তত তাঁদের নিশ্চিত ভাবেই প্রাপ্য।

Translated by Tanmay Mukherjee

loader