শিশুদের মুণ্ডন করানো হয় কেন? জেনে নিন আসল কারণগুলো।

আমার ছেলের বয়স সদ্য এক বছর পূর্ণ হয়েছে। স্বাভাবিক কারণেই ওর প্রথম জন্মদিন নিয়ে আমাদের মধ্যে উদ্দীপনার অভাব ছিল না। কিন্তু একটা বিষয় নিয়ে আমাদের নিজেদের মধ্যেই প্রচুর তর্ক বিতর্ক হয়েছে; বিষয়টা ছিল ওর মুণ্ডন অনুষ্ঠান। মুণ্ডন, বা ন্যাড়া করানো বা মোট্টাই; অনুষ্ঠানটাকে দেশের এক এক প্রান্তে এক এক নামে ডাকা হয়। কিন্তু মূল রীতিটা মোটের ওপর একই; শিশুর জীবনের প্রথম বার চুল কাটা বা এ এক্ষেত্রে ন্যাড়া করা। সাধারণত এ’টা অনুষ্ঠিত হয় মন্দির বা কোনও ধর্মীয় স্থানে।  

তবে ধর্মীয় কারণ যাই থাক, আমি নিজে অন্তত মুণ্ডনের ব্যাপারে বেশ দুশ্চিন্তায় ছিলাম। বাচ্চার এই বয়সের চুল এত সুন্দর হয়, সেগুলো কেটে ফেলার কথা ভাবলেও বাবা মায়েদের রীতিমত কষ্ট হওয়ার কথা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা মেনে নিতেই হয়েছিল; কিছুটা গুরুজনদের চাপে, কিছুটা ধর্মীয় বিশ্বাসের জায়গা থেকে আর খানিকটা যুক্তি দিয়ে বিচার করে। মুণ্ডনের সময় আমার ছেলের কান্না আর চিৎকারে কান পাতা দায় হয়ে পড়েছিল। কিন্তু আমার তখন কিছুই করার ছিল না, অসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া। ওর কষ্ট দেখে তো আমি কেঁদেই ফেলেছিলাম। 

তবে খুব কম লোকই জানেন যে মুণ্ডনের পিছনে কিছু বিজ্ঞান-নির্ভর যুক্তিও রয়েছে। অবশ্য আগে আমারও ধারণা ছিল যে গোটা অনুষ্ঠানটা স্রেফ বহুযুগ পুরনো রীতিনীতির একটা অংশ মাত্র। এই লেখাতে আমি চেষ্টা করেছি মুণ্ডন সম্বন্ধে যাবতীয় জানা অজানা তথ্যকে তুলে ধরতে। 

মুণ্ডন অনুষ্ঠান আদতে কী? 

শিশুর চুল প্রথম বারের জন্য কেটে ফেলার অনুষ্ঠান; যে’টা করা হয় ধর্মীয় আচার-বিধি মেনে। বিভিন্ন সামাজিক নিয়ম, ধর্মীয় নিদান বা যুক্তি মেনে; এক এক সম্প্রদায়ের মধ্যে শিশুর এক এক বয়সে মুণ্ডন করানোর রীতি চালু আছে; কখনও ছয় মাস, কখনও এক বছর বা কখনও শিশুর তিন বছর বয়সের মাথায় এ’টা অনুষ্ঠিত হয়। 

মুণ্ডন কেন করা হয় ? 

যেমনটা আগেই বলেছি, এর পিছনে ধর্মীয় আচারব্যবহার ছাড়াও বৈজ্ঞানিক যুক্তিও রয়েছে। যেমন:

১। এ’তে শিশুর ওপর থেকে যে কোনও অসাধু শক্তির কুপ্রভাব কেটে যায়। যে কোনও অন্ধকারের স্পর্শ কাটিয়ে উঠে শিশুর জীবন নতুন উদ্যমে এগিয়ে চলে। 

২। অনেক পরিবারে শিশুর এক বছরের জন্মদিন পালিত হয়ে মুণ্ডন অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে। 

৩।  মাথার চুল কামিয়ে ফেলার পর শিশুরা একটু হালকা বোধ করে। তাছাড়া সর্দি কাশির উপদ্রবও কমে আসে। সে কারণেই অনেকে চেষ্টা করে মুণ্ডনের ব্যাপারটা গরমকালে সেরে ফেলতে। 

৪। নতুন দাঁত বেরোনোর সময় শিশুদের বেশ ভুগতে হয়, মুণ্ডনে সেই সমস্যা নাকি খানিকটা হলেও লাঘব হয়। 

৫। মুণ্ডনের প্রভাবে শিশুর বুদ্ধিমত্তা আর জ্ঞানও বৃদ্ধি পায়। বিশ্বাস তেমনটাই বলে। 

শিশুর মাথা ন্যাড়া করা কি জরুরী? 

শিশুর মাথা ন্যাড়া করানো কি আবশ্যক? বাধ্যবাধকতা কিছুই নেই, সিদ্ধান্তটা পুরোপুরি বাবা মায়ের হাতে। সবটুকুই নির্ভর করছে তাঁদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচারবিচারের ওপর। 

করানো কেন উচিৎ? ধর্মীয় নিয়ম কানুন, সাবেকী আচারবিচার; এই সব মানলে মুণ্ডন করাতেই হয়। তাছাড়া এ’তে গুরুজনরাও সন্তুষ্ট হবেন। 

করানো কেন উচিৎ নয়? এই মুণ্ডন প্রথার সঙ্গে আপনার শিশুর চুলের বাড়বাড়ন্তের কোনও সম্পর্ক নেই। অনেক সময় বাবা মায়েরা শিশুর কষ্টের কথা ভেবেও মুণ্ডনের প্রথাটা এড়িয়ে যান। 

মুণ্ডন সুষ্ঠু ভাবে সম্পন্ন করতে যে কাজগুলো করা দরকার: 

১। নতুন রেজার আর ব্লেড ব্যবহার করুন। চুল কাটার সমস্ত সরঞ্জাম স্টেরিলাইজ করে রাখা উচিৎ যাতে ইনফেকশনের কবল থেকে শিশুকে রক্ষা করা যেতে পারে। 

২। শিশুর ছ’মাস বয়সের মাথায় মুণ্ডন করিয়ে নেওয়াটাই উচিৎ। তা’তে শিশুরা বেশি কষ্ট বা যন্ত্রণা টের পাবে না। আর ওই বয়সের শিশুকে চুল কাটার সময় ধরে রাখাও সহজ হবে।   

৩। মুণ্ডন হয়ে গেলে শিশুকে উষ্ণ জলে স্নান করান। 

৪। চুল কাটার সময় শিশুর মাথা কেটে গেলে অ্যান্টিসেপ্টিক ক্রীম লাগান। তাছাড়া চিরাচরিত পদ্ধতিতে চন্দন আর হলুদ মিশিয়েও লাগাতে পারেন। 

৫। চুল কাটার সময় শিশুরা চঞ্চল হয়ে উঠবেই, এ সময় তাদের ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা করতে হবে। পারলে সেই সময় ওদের প্রিয় ছড়া বা গান শুনিয়ে শান্ত রাখার চেষ্টা করুন। 

Translated by Tanmay Mukherjee

loader