বাবা মায়ের দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন করছেন তো? সেই দায়িত্বপালনে গাফিলতির মোক্ষম চিহ্নগুলো চিনে নিন।

প্রত্যেক বাবা মা চাইবেন যে তাঁদের সন্তানকে বড় করে তোলায় যেন কোনও খামতি না থাকে আর তাদের ব্যবহার যেন সবসময় দৃষ্টান্তমূলক হয়। বাবা মায়ের ব্যবহার এবং কথাবার্তা সন্তানের চরিত্রের প্রগাঢ় প্রভাব ফেলে। আজ্ঞে হ্যাঁ, বাবা মা কী বলছেন, কী কাজকর্ম করছেন; এই সবকিছুই সন্তানের চরিত্র গঠনে জরুরী। নীচে কিছু মানসিক সমস্যার কথা উল্লেখ করা হল। সন্তানের মধ্যে সেগুলো দেখতে পেলেই জানবেন তাদের বড় করে তোলার মধ্যে কোথাও কোনও বড় গলদ থেকে গেছে: 

 (ডেভিড উল্ফ থেকে সংগৃহীত) 

১। দুশ্চিন্তা এবং বিষাদ:

যে বাপ মায়ের পদে পদে নিজের সন্তানের নিন্দায় মুখর হয়ে ওঠেন, তাঁরা কিন্তু ছোট ছেলেমেয়েদের সহজেই উদ্বেগ ও বিষাদের দিকে ঠেলে দিতে পারেন। সন্তানকে আগলে রাখা ভালো তবে বাড়াবাড়ি সমীচীন নয়। তেমনই প্রতি পদে নিন্দাও শিশু মনের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এ’তে শিশুরা ক্রমশ নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে এবং সবকিছুকে ভয় পেতে শুরু করে। জীবন-যুদ্ধে ক্রমশ তারা হারিয়ে যেতে শুরু করে।

২। সহজভাবে বা নিশ্চিন্তে থাকতে না পারা।

বাবা মায়ের কাছ থেকে বারবার “এ’বার একটু সিরিয়াস হও” বা “ছেলেমানুষি বন্ধ কর” গোছের ধমক শুনে গেলে ছেলেমেয়েরা ক্রমশ সহজ সরল ভাবে, চিন্তা দূরে সরিয়ে সময় কাটাতেই ভুলে যায়। ছেলেমানুষেরা ছেলেমানুষি করবে, সে’টাই স্বাভাবিক।  বাবা মায়েরা যদি একটানা ছোটদের ‘বড় হয়ে গেছ, এই সব ছেলেমানুষি তোমার আর সাজে না’ ধরণের কথা বলে চলেন, তাহলে শিশুরা মানসিক চাপ অনুভব করবেই। এই চাপে পড়ে ছোট ছোট শিশুরাও উদ্বিগ্ন হতে শুরু করে এই ভেবে যে তাদের ছেলেমানুষিতে বাকিরা কী ভাববে!

৩। বদ নেশা।

বাবা মায়েরা যদি সবসময়েই ছেলেমেয়েদের বলে চলেন যে “তোরাই যত নষ্টের কারণ” তাহলে  সেই শিশুরা ক্রমশ নিজেদের অপদার্থ বলে ভাবতে শুরু করবে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ সে অনিষ্টকর দিকে ঝুঁকে পড়ে, সে’টা কোনও বিষাক্ত নেশাই হোক বা বিপদজনক খেলাধুলো। যে নিজেকে মূল্যহীন মনে করে সে বারবার নিজেকে বিপদের মুখে ঠেলে দেবে সে’টাই স্বাভাবিক। 

৪। আত্মসম্মানবোধ তলানিতে ঠেকে যাওয়া।

বাবা মায়েরা যখন প্রত্যেক বিষয়ে নিজেদের ছেলে বা মেয়েকে অন্যদের সঙ্গে তুলনা করে তখন সেই ছেলে বা মেয়ের আত্মসম্মান ক্রমশ কমতে থাকে। 

“তোর বোন পরীক্ষায় কত ভালো নম্বর পেয়েছে, অথচ তুই একটা অপোগণ্ড”।

“বুবাই কত ভালো ব্যাডমিন্টন খেলে অথচ তুই এখনও র‍্যাকেট ধরতেই শিখলি না”।

এই ধরণের কথাবার্তা ক্রমশ একজন শিশুর মনে ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্সের জন্ম দেয়। সেই শিশু বড় হয়েও নিজেকে ক্রমাগত অন্যদের সঙ্গে তুলনা করে হীনমন্যতায় ভোগে। তাদের বারবার মনে হয় যে তাদের দিয়ে কোনও কাজই হওয়ার নয়।

৫। অবিশ্বাস। 

অপরিচিত মানুষজনক সমঝে চলার শিক্ষা শিশুদের অবশ্যই দেওয়া উচিৎ। কিন্তু সর্বক্ষণ যদি তাদের বলা হয় যে নতুন মুখ মানেই বিপদ তা’হলে তাদের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস গেঁথে দেওয়া হবে। তাদের জীবনের যাবতীয় সম্পর্ক ভঙ্গুর হয়ে পড়বে কারণ তাদের চারপাশ জুড়ে থাকবে অবিশ্বাসের অন্ধকার।

৬। প্রতিভা বিকশিত না হওয়া আর উদ্যোগের অভাব। 

সব ছোটরা যেন মনের সুখে স্বপ্ন দেখে যেতে পারে। কেউ যেন তাদের স্বপ্নগুলোকে অলীক বলে উড়িয়ে না দেয় কারণ এ’তে তাদের অন্যরকম কিছু করার ইচ্ছেটাই মরে যেতে পারে। নিজের সন্তানের স্বপ্নগুলোকে ব্যঙ্গ বা বিদ্রূপের ঝাপটায় উড়িয়ে দেবেন না, এ’তে তাদের ভিতরের প্রতিভাগুলো হারিয়ে যাবে। ক্রমশ এদের মধ্যে থেকে নতুন কিছু করার ইচ্ছেগুলোও হারিয়ে যাবে। লোক হাসানোর ভয়েই এরা নিজেদের প্রতিভাকে খুন করে।

৭। বিষণ্ণতা এবং অপরাধবোধ।

বেশির ভাগ বাবা মাকেই অনেক ত্যাগস্বীকার করতে হয় সন্তানের মঙ্গলের জন্য। কিন্তু কোনও বাবা বা মা যদি সন্তানদের একটানা হিসেবের খাতা খুলে ফিরিস্তি দিয়ে চলেন নিজেদের ত্যাগস্বীকারের, তাহলে সে সন্তান ক্রমশ বিষণ্ণ হয়ে পড়বে, সে ক্রমশ নিজেকে অপরাধী ভাবতে শুরু করবে। শিশুটির মনে হবে যে সে এতই নিকৃষ্ট যে ভালো কোনও কিছুই তার জোটা উচিত না, সে’টা শিক্ষাই হোক বা আশ্রয় বা ভালো জামাকাপড়টুকু পর্যন্ত। শিশুটির মনে হয় যে সে নিজেই আদতে একটা প্রকাণ্ড সমস্যা। এই বিষণ্ণতার ভার তাকে বয়ে বেড়াতে হবে আজীবন।

৮। নিজের অনুভূতিগুলো লুকিয় লুকিয়ে রাখা।

বাবা মায়ের মধ্যে সংবেদনশীলতার অভাব বা অনুভূতিগুলো লুকিয়ে রাখার প্রবণতা অনেক সময় শিশুর মধ্যে প্রভাব ফেলে। “আর যেন কাঁদতে না দেখি” বা “সবসময় ঘ্যানঘ্যান কোরো না”; এই ধরণের কথা একটানা শুনলে শিশুরা ক্রমশ ভাবতে শুরু করে জীবনে সংবেদনশীলতা আদৌ গুরুত্ববহ নয়। এরা অন্য কারুর সান্নিধ্যে এলেই নিজেদের গুটিয়ে নেয় এবং জীবনে বহুবিধ সমস্যার মুখোমুখি হয়।

৯। স্বাধীনচেতা হতে না পারা।

কিছু বাবা মায়েরা নিজেদের সন্তানকে আগলে রাখার চেষ্টায় বাড়াবাড়ি করে ফেলেন। এবং এই সব ক্ষেত্রে অনেক সময় শিশুরা বড় হয়ে দায়িত্বজ্ঞানহীন আর বোধবুদ্ধিহীন জড়ভরত হয়ে ওঠে।  সবসময়ে যদি সন্তানকে কড়া নজরে রাখতে গিয়ে ওকে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে মেলামেশা বন্ধ করে দিয়ে থাকেন, তা’হলে বড় হয় সে সবিশেষ সমস্যার সম্মুখীন হবে। এ ক্ষেত্রে শিশুরা বড় হয়ে ক্রমশ  পরনির্ভরশীল এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন হয়ে ওঠে। জীবনের সমস্ত বড়সড় সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে তারা হোঁচট খাবেই।

Translated by Tanmay Mukherjee

loader