এক সন্তান থাকার সুবিধে অসুবিধেগুলো।

এ সংসারে থাকতে হলে উপদেশের বোঝা বয়ে বেড়াতেই হবে। তবে কাকীমা জেঠিমাদের সমস্ত উপদেশ মেনে চলতে গিয়ে নিজের জীবনটা ওলটপালট করে ফেলবেন না যেন, কিছুতেই না। 

আর এই গায়ে পড়া উপদেশ বৃষ্টি কোনও দিনও থামবে না। আমার নিজের জীবনে অনেক বার মনে হয়েছে এ’বার বোধহয় পাড়া প্রতিবেশী আত্মীয়স্বজন সবাইকে সন্তুষ্ট করতে পেরেছি। কিন্তু বিশ্বাস করুন, সে’টা অসম্ভব। কেন?

এই যেমন ধরুন আমি যখন তিরিশ বছর বয়সে এসেও বিয়েথার কথা ভাবছিলাম না, তখন সকলের চিন্তা ছিল আমি আদৌ বিয়ে করব কিনা। 

এনগেজমেন্ট সেরে নেওয়ার পর ভাবলাম নিশ্চিন্ত হওয়া গেল কিন্তু ও মা! তখন সবার প্রশ্ন হল এ’বার বিয়েটা করব কবে?

বিয়ের পরপরই লোকজনের মনে নতুন চিন্তা শুরু হল; “ছেলেমেয়ের ব্যাপারে কী প্ল্যান করেছ”? 

বিয়ের চার বছরের মাথায়ও যখন আমি মা হওয়ার ব্যাপারে ভাবনাচিন্তা শুরু করিনি; তখন আড়ালে আবডালে অনেকে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করতে লাগল।; “ওর কি কোনও প্রবলেম ট্রবলেম আছে নাকি”? 

শেষ পর্যন্ত মা হয়ে আমার মনে হলো এ’বার হয়ত সবার প্রাণ জুড়ল আর এইবারে নিশ্চিত ভাবেই প্রশ্নের ঝড় থামবে। 

নাহ্‌। সে গুড়েও বালি। 

আমার সন্তানের জন্মের পরেই নতুন নতুন প্রশ্ন আর মন্তব্য আমার দিকে ধেয়ে আসতে শুরু করল।  

“সে কী! তোমাদের কি আর কোনও ছেলেমেয়ের প্ল্যান নেই”? 

“আরে শোনো, তোমার যা বয়স, দ্বিতীয় সন্তানের ব্যাপারে এখনই সিদ্ধান্ত নিয়ে নেওয়া ভালো। নয়তো পরে অনেক রকম সমস্যা দেখা দিতে পারে”। 

আজ্ঞে হ্যাঁ। সেই পুরনো তর্ক; এক সন্তানের বাবা মা হওয়াই কি ঠিক? প্রায় প্রতিটি বাবা মায়েরাই এ সম্বন্ধে বহুবিধ জ্ঞান শুনে অভ্যস্ত। নারীর ব্যক্তিগত পরিসর আর তাঁর মাতৃত্ব নিয়ে হাজার জনের হাজার রকমের মত। যার সন্তান নেই, তাঁদের প্রতি করুণার ভার চাপিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত সমাজের স্বস্তি নেই, যার বহু সন্তান তাঁদের ব্যাপারেও বক্রোক্তি আকছার ছুঁড়ে দেওয়া হয়। কেউ সন্তান না চাইলে তাঁদেরকে প্রায় ঘৃণার চোখে দেখা হয়। মানে কোনও ভাবেই আপনি সমালোচনার ছুরির ঘা থেকে বেঁচে বেরোতে পারবেন না।  আমার মত মহিলার কথাই ধরুন, সন্তান হওয়ার এক বছরের মাথায় আমার দিকে অসংখ্য উপদেশের বন্দুক তাক করে ক্রমাগত দেগে চলা হয়: ” এক বছর তো হলো, পরের বাচ্চার জন্য আরও অপেক্ষা করা ঠিক হবে না”; ইত্যাদি। 

“যার কোনও ভাই বোন থাকে না সে সহজে অন্যদের সঙ্গে মিশতে পারে না, অন্তর্মুখী চরিত্রের মানুষ হয়”। (আদতে ঘটে ঠিক উল্টোটা)। 

“ভাই বোনের সঙ্গ ছাড়া যারা বড় হয় তাঁরা স্বার্থপর হয়ে ওঠে”। ( আমায় যখন এই সদুপদেশটা একজন মা ভালোবেসে শোনাচ্ছিলেন তখন তাঁরই পিছনে তাঁর দুই বাচ্চা সামান্য একটা খেলনার জন্য নিজেদের মধ্যে মারামারি করে যাচ্ছিল। ভাবুন কী অদ্ভুত মানসিকতা! আমার বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল আগে নিজের বাচ্চাদের সামলান গিয়ে)। 

“বাবা মা চলে যাওয়ার পর ও এই পৃথিবীতে একদম একলা হয়ে পড়বে” ( ধুরছাই! অমনটা হতে যাবেই বা কেন? বাবা মা না থাকলে কি একজনের পাশে শুধু তাঁর নিজের ভাইবোনেরাই থাকতে পারে? বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন; সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে পারলেই হল। 

কাজেই বুঝতেই পারছেন আমার এক বছর বয়সী ছেলের ব্যাপারে আমায় কী অদ্ভুত সব কথা শুনতে হয়েছে’; ও নাকি একাকীত্বে ভুগবে, বদমেজাজি হবে, নির্বান্ধব হয়ে জীবন কাটাতে হবে; এমন কী সাইকোপ্যাথ হয়ে ওঠাও আশ্চর্যজনক নয়! বিশ্বাস করুন, আমার ওই পুচকে হাসিখুশি মিষ্টি ছেলেটার ব্যাপারে আমার এ’টাও শুনতে হয়েছে যে বড় হয়ে ও সাইকোপ্যাথ হবে। 

একজন ক’জন সন্তানের মা হবেন সে’টা একান্তই তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাপার আর এ নিয়ে অন্যের নাক গলানো মোটেও সমীচীন নয়। 

আর সবচেয়ে জরুরী ব্যাপার হল যে আজকালকার যুগে এক সন্তানের সংসার তেমন বিরল কিছু নয়। 

এক সন্তানের মা হওয়া খুবই স্বাভাবিক ঘটনা! এক সন্তান মানেই সে অসামাজিক, অকাজের বা পরমুখাপেক্ষী হয়ে উঠবে; এ’সব আজগুবি ভাবনাগুলো থেকে এ’বার বেরিয়ে আসার সময় হয়েছে। বাবা মায়ের একমাত্র সন্তানটিও সুস্থ, স্বাভাবিক এবং সুন্দর ভাবে বড় হয়ে উঠতে পারে। অনেক সময় ওদের বাড়তি সুবিধেও থাকে কারণ বড় হওয়ার সময় ওরা বাবা মা বা দাদু দিদিমাদের সঙ্গে বাড়তি সময়টুকু কাটাতে পারে। 

এর মানে এই নয় যে ভাই বোন না থাকাটাই একজন বাচ্চার জন্য ভালো, আমি ভুলেও সে কথা বলতে চাইনি। আমি শুধু বলছি আমাদের চিন্তা ভাবনায় যে’টা সঠিক সে’টা অন্যের ঘাড়ে না চাপিয়ে দেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। 

আপনি যদি দু’জন সন্তানের একজন হিসেবে বড় হয়ে থাকেন, আপনার সে’টাই আদর্শ মনে হবে, তিন সন্তানের একজন হলে সে’টাকে আপনার সঠিক মনে হবে। কিন্তু আপনার বোঝা উচিৎ যে এ ক্ষেত্রে কোনও নির্দিষ্ট মাপকাঠি রাখা সম্ভব নয়। 

একজন শিশু কেমন ভাবে বড় হয়ে উঠবে সে’টা পুরোপুরি নির্ভর করে মা বাবা তাকে কেমন ধরণের শিক্ষা ও আদর্শে বড় করে তুলছে তার ওপর। শিশুর ভবিষ্যতের সঙ্গে বাবা মায়ের সন্তান সংখ্যার কোনও যোগাযোগ নেই। 

অবশ্য কৌরবদের ব্যাপার নিয়ে চট করে কোনও মন্তব্য করাটা ঠিক হবে না মোটেও। 

(The M Word থেকে সংগৃহীত)

Translated by Tanmay Mukherjee

loader