ভারতবর্ষে আজও প্রেগন্যান্ট মহিলাদের যে চোখে দেখা হয়!

বডি শেমিং ব্যাপারটা নতুন কিছু নয় আর সর্বত্রই ঘটছে। প্রেগন্যান্ট না হলেও আপনাকে এমন অনেক ঘৃণ্য মন্তব্য শুনতে হতেই পারে। সত্যি কথা বলতে কী আমাদের দেশে অন্তত বডিশেমিং ব্যাপারটা আমাদের রোজকার গল্প আড্ডার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর আমাদের অনেকেরই ধারণা যে একজন সন্তানসম্ভবা মহিলার বাড়তি ওজন বা দেহের অন্যান্য পরিবর্তনগুলো নিয়ে ঠাট্টা করাটা বেশ মজাদার হতে পারে। হাসি ঠাট্টার সময় আমাদের মধ্যে অনেকেই এমন বেহিসাবি হয়ে পড়েন যে তাঁরা ভুলে যান যে প্রেগনেন্সির সময় ওজন বাড়াটা একটা রীতিমত স্বাভাবিক ব্যাপার।  প্রেগনেন্সির মত সুন্দর আর সংবেদনশীল সময়েও আমাদের দেশের অনেক মহিলাকে বিভিন্ন রকম নিষ্ঠুর বডি শেমিং ঠাট্টার মুখোমুখি হতে হয়। তেমনই কিছু বডি শেমিংয়ের উল্লেখ রইল এই প্রবন্ধে।

“খুব তাড়াতাড়ি খুব বেশি মোটা হয়ে পড়েছ”।

এ’টা বলা আর “তুমি ফুলে প্রায় বেলুনের মত হয়ে পড়েছ” বলা একই ব্যাপার। আমি নিজে যখন দ্বিতীয় বারের জন্য প্রেগন্যান্ট হয়ে পড়ি তখন আমার অফিসের এক সিনিয়র স্টাফ আমায় বলেছিলেন “তোমার পেট তিন মাসে যতটা বড় হয়েছে আমার পেট ছয় মাসেও ততটা বড় হয়নি”। আমি শুধু অবাক হয়ে তাকিয়েছিলাম তাঁর দিকে, কোনও উত্তর দেওয়া হয়নি। ওর প্রেগনেন্সির খবরাখবর আমায় জানানোর যে কোনও মানে নেই, সে কথাও বলা হয়নি। তবে আমাদের দেশে প্রেগন্যান্ট মহিলাদের এমন ধরণের কথাবার্তা আকছারই শুনতে হয়।

“এত ওজন বেড়ে গেছে, প্রেগনেন্সির পর কমাবে কী করে”?

আপনার প্রেগনেন্সির সময় আদত বন্ধুবান্ধবেরা চাইবেন যে আপনি সুস্থ থাকুন, আপনার ওজন সঠিক ভাবে বেড়ে চলুক। ডায়েট আর খাওয়ার ইচ্ছে-অনিচ্ছা সামাল দেওয়ার ব্যাপারে এই বন্ধুরা আপনাকে সঠিক ভাবে সাহায্য করতে চেষ্টা করবেন। তেমন কিছু আদর্শ বন্ধুবান্ধব আপনার নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু কয়েকজন এমনও আছেন যারা প্রেগনেন্সির পরে বাড়তি ওজন কমানো নিয়ে আপনার মাথায় রীতিমত দুশ্চিন্তা মাথায় ঢুকিয়ে দিতে পারে। অথচ এই সময় আপনার মূলত নিজের শিশুর স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবা উচিৎ। প্রেগন্যান্ট মায়েরা এমন অনেক অদরকারি বডি শেমিং মন্তব্য শুনে মানসিক চাপ অনুভব করতে শুরু করেন  এবং নিজের শরীরের ব্যাপারে অস্বস্তিতে ভোগেন।

“এখন তো তোমায় দু’জনের জন্য খেতে হচ্ছে” এই ধরণের বাঁকা মন্তব্য।  

প্রেগন্যান্সির সময় অনেক অদ্ভুত মন্তব্য শুনতে হতে পারে, সেই সব মন্তব্যগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কটু হল এ’টা। সমস্ত মায়েদের হয়েই বলছি, একজন অন্তঃসত্ত্বা মহিলাকে দু’জনের খাবার খেতে হয় এই ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। আমরা যতই চেষ্টা করি এক জন মানুষের পক্ষে দু’জন মানুষের খাবার খাওয়া অসম্ভব। ঘটনা হচ্ছে প্রেগনেন্সির সময় খাওয়াদাওয়া করাটাই একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। আর এরপর কেউ যদি কোন প্রেগন্যান্ট মহিলাকে নিজের বাড়তি ওজন সামাল দিতে কম খাওয়ার কথা বলেন তাহলে তৎক্ষণাৎ তাঁকে জানান দিন যে তাঁর উপদেশ ভ্রান্ত। আর এই ধরণের উপদেশের ফলে মা আর শিশু দু’জনেরই স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

“তুমি যথেষ্ট এক্সারসাইজ করছ তো”?

এই ধরণের মন্তব্য কেউ করে থাকলে তিনি বেনিফিট অফ ডাউট পেতেই পারেন। তিনি হয়ত তাঁর পরিচিত প্রেগন্যান্ট মহিলাকে সত্যিই সুস্থ থাকার জন্য সৎপরামর্শ দিতে চাইছেন। কিন্তু যদি প্রেগন্যান্ট মহিলার স্বাস্থ্যের বদলে তাঁর বাহ্যিক সৌন্দর্যের নিরিখে এই পরামর্শ  দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে নিশ্চিন্তে বলা যায় এই পরামর্শ মন্দ এবং ক্ষতিকারক।

“তোমার এমন সব খাবার খাওয়া উচিৎ যাতে ফ্যাটের পরিমাণ কম রয়েছে”।

যারা এই ধরণের উপদেশ দিয়ে থাকেন তাঁরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই জানেন না কী ভাবে লো ফ্যাট বা হাই ফ্যাট খাওয়াদাওয়ার বেছে নিতে হবে। তাঁরা স্রেফ সুযোগ পেলেই ডায়েট কনসাল্ট্যান্টের ভঙ্গীতে দু’চারটে বড় বড় উপদেশ ভাসিয়ে দিয়ে জ্ঞানীগুণী সাজতে চান। আর এই সব উদ্ভট উপদেশের ফলে অনেক মায়েরা চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন আর বাদামের মত উপকারী খাবারদাবার (যা কিনা সলিউবল ফ্যাটে পরিপূর্ণ আর গর্ভের শিশুর জন্য অত্যন্ত উপকারী) নিজের ডায়েট থেকে বাদ দেন। এ’টা বোঝাটা খুব দরকারি যে একজন প্রেগন্যান্ট মহিলার দরকার ব্যালান্সড ডায়েট; এ’টা শুধু তাঁর জন্যই নয়, তাঁর গর্ভের শিশুর জন্যও জরুরী।    

“তোমার ঢলঢলে জামাকাপড় পরা উচিৎ”।  

সোজাসুজি বডি শেমিং না করে ঘুরিয়ে ফিরিয়েও নানা রকম অপমানজনক কথাবার্তা বলা যেতেই পারে। যেমন গর্ভবতী মহিলার পোশাকের ঠিক বেঠিক নিয়ে করা কোনও বাঁকা মন্তব্য।  অনেক সময় গর্ভবতী মহিলাদের উপদেশ দেওয়া হয় লুজ ফিটিং কাপড়জামা পরার জন্য। একটা সহজ সত্য অনেকেই অনুধাবন করতে চান না যে একজন প্রেগন্যান্ট মহিলার কিছুটা সময় লাগে শারীরিক পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে আর এই ধরণের বেহিসাবি মন্তব্য প্রেগন্যান্ট মহিলাদের কাজটা আরও কঠিন করে তোলে।   

ফিচার ছবির সূত্র: thehealthsite.com

 

Translated by Tanmay Mukherjee

loader