ধর্ষণের ফলে আমাদের ছেলের জন্ম হয়, কিন্তু ও আমাদের জীবনের সব চেয়ে বড় আশীর্বাদ।

আপনার স্ত্রী যদি ধর্ষণের ফলে সন্তানধারণ করতেন, তাহলে কি সেই সন্তানকে আপনি আপন করে নিয়ে নিজের সন্তানের মত বড় করতে পারতেন? জেফ্‌ কিন্তু জেনিফারের জন্য ঠিক তাই করেছিলেন। পুরো ঘটনাটা জেফের জবানিতে দেওয়া রইল আপনাদের জন্য:

এই বিষয়টা নিয়ে খুব বেশি ভাবনা চিন্তা করতে আমার ভালো লাগে না। “আমার স্ত্রীকে ধর্ষণ করা হয়েছিল” এই কথাগুলো বলতে আজও আমার খুব কষ্ট হয়। 

ঘটনাটার কথা মনে পড়লেই আমার মনে হয় আমি রাগে, দুঃখে আর ঘেন্নায় অবশ হয়ে পড়ব; আমার খুব ইচ্ছে করে সেই ইতরটাকে খুঁজে বের করে ওঁকে উচিৎ শাস্তি দিই। তবে রাগ-দুঃখ বাদেও আমার আর জেনিফারের সামনে যে’টা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সে’টা হল আমাদের পাহাড়-প্রমাণ বিষণ্ণতার সঙ্গে যুদ্ধ করা। জেনিফারের সঙ্গে যে অন্যায় হয়েছিল, সে’টাকে তুড়ি মেরে ভুলিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। ওঁর সেই দুঃখকে ঝেড়ে-পুছে সাফ করতেও আমি পারব না। আমার মাথার মধ্যে অনেক আফসোস ঘোরাফেরা করে। মাঝেমধ্যেই আমার মনে হয় সবকিছু যদি অন্যরকম হত, তাহলে কী ভালোই না হত। জেনিফার যে হোটেলে সে’দিন ছিল, আমি ভেবেছিলাম সেই দিনই সে’খানে গিয়ে উঠে ওঁকে একটা চমৎকার সারপ্রাইজ দেব, কিন্তু শেষ পর্যন্ত যাওয়া হয়নি। আমার হয়ত ওঁকে আরও ভালো ভাবে বোঝানো উচিৎ ছিল অন্য শহরের চাকরীতে জয়েন না করতে। এমন বহু ‘যদি’ মনের মধ্যে ভেসে বেড়ায়, কিন্তু হয়ত আমাদের কপাল নেহাতই মন্দ। ওই ঘটনার পর ডিপ্রেশন কাটিয়ে ওঠার জন্য জেনিফার যখন থেরাপিস্টের দ্বারস্থ হয়েছিল তখনই আমরা জানতে পারি যে ও প্রেগন্যান্ট। আমার এখনও মনে আছে যখন প্রথম ও আমায় খবরটা জানায়। ও সম্ভবত আরুবার কাছে কোন ক্রুজ শিপে কাজ করছিল ; সেখান থেকেই আমায় ও ফোন করে বলে; “আমি প্রেগন্যান্ট”। 

শুরু থেকেই আমি জানতাম আমার কী করা উচিৎ। অনেকে হয়ত আমার সিদ্ধান্তে অবাক হয়েছে, কিন্তু লোকের অবাক হওয়াটাই আমার কাছে বেশি আশ্চর্যজনক লাগে। কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল; তা নিয়ে এক মুহূর্তের জন্যও আমার মনে কোন সন্দেহ ছিল না। একটা শিশুর জন্ম মানে নতুন পথ চলার শুরু; আর আমি ঠিক সে’টাই চাইছিলাম। শিশুটিকে আমরা সমস্যা নয়, সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখতে চেয়েছিলাম। 

“আমি প্রেগন্যান্ট”, এ’টার পরে কিছুতেই জিজ্ঞেস করা উচিৎ না “এখন আমাদের কী করা উচিৎ”? জেনিফারকে কোনও ধর্ষক প্রেগন্যান্ট করেছে বা ধর্ষণের ফলে ও প্রেগন্যান্ট হয়েছে; এমনভাবে ভাবাটা অমানবিক। ঘটনা হল আমার স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা, যে আসতে চলেছে সে আমাদের দু’জনের সন্তান! নতুন ক্যানভাসে তুলির প্রথম আঁচরের মত নতুন ভাবে সব কিছু শুরু হওয়ার কথা। 

আর শিশুটির কথা যদি বলি, তার নিজের জন্মের ক্ষেত্রে তার নিজের কোনও ভূমিকা ছিল না। তাকে দোষ দিয়ে কী হবে? 

আমরা জানতাম যে এই প্রেগনেন্সি জেনিফারের জন্য মানসিক আর শারীরিক ভাবে সহজ হবে না, কতটা কঠিন হবে সে সম্বন্ধে স্পষ্ট ধারণাও আমাদের ছিল না। আমরা শুধু এ’টা জানতাম যে এক শিশুর চেয়ে নির্মল আর সুন্দর কিছু হতে পারে না। একটা শিশুই বরং পারে সেই দুর্ঘটনার জ্বালা কিছুটা কমাতে। অনেকের কাছে এ’টা অদ্ভুত ঠেকলেও আমরা সবসময়ই আমাদের সন্তানকে নিজেদের জীবনে পরম আশীর্বাদ বলে মেনে নিয়েছি। 

আমি আমার ছেলেকে কখনও “অন্যের ছেলে” বলে ভাবতে পারিনি। আমার স্ত্রীর জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়ের মধ্যে দিয়ে যখন আমরা যাচ্ছিলাম, এই সন্তানই আমাদের জীবনের আশার আলো এনে দিয়েছিল। সেই দুর্ঘটনার সঙ্গে আমাদের ছেলেকে আমরা কখনও গুলিয়ে ফেলিনি। আমি আমার অন্য ছেলেমেয়েদের জন্মবৃত্তান্ত নিয়ে তো বিশেষ গবেষণা করি না; আমি তো ওদের ক্ষেত্রে এ’টা ভাবিনা যে ওর বেলায় আমার স্ত্রী অমুক ভাবে প্রেগন্যান্ট হয়েছিল বা তেমন কিছু। তাহলে আমার এই ছেলের ব্যাপারে সেই সব ভেবে অযথা দুশ্চিন্তা কেন করব? 

জেনিফার আর আমার আত্মিক আর মানসিক বন্ধন অত্যন্ত গভীর। আমরা পনেরো বছর বয়স থেকে একে অপরকে ভালোবাসি। আমরা একে অপরকে খুব ভালো ভাবে চিনি, জানি, বুঝি আর এই ব্যাপারে আমাদের দু’জনের মনেই কোনও সন্দেহ ছিল না। আমার স্ত্রী প্রেগন্যান্ট ছিল, ওর গর্ভের সন্তান আমাদের দু’জনেরই। এর বেশি কিছু ভাবার দরকার ছিল না। 

ধর্ষণের ঘটনার পর দু’বছর কেটে গেছে। আগের মত না হলেও, এখনও মাঝেমধ্যেই প্রচণ্ড রাগ হয়। সেই ঘটনার জন্য জেনিফারকে আজও নানা রকম যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়; সে’গুলোও বুঝতে পারি। ধর্ষণের মত ঘটনার বিভিন্ন কুপ্রভাব আজীবন থাকে, সে’গুলোকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়া সহজ নয়। কিন্তু তার পাশাপাশি যে’টা আমাদের আনন্দে থাকার রসদ যুগিয়েছে সে’টা হল আমাদের ১৮ মাস বয়সী ছেলে। আমার ছেলেমেয়েদের মধ্যে ওই আমার সব চেয়ে প্রিয়। শিশুরা আপনার জীবন নির্মল হাসি আর আপনভোলা আনন্দে ভরিয়ে রাখতে পারে এবং সেই আনন্দ ক্রমশ বাড়তে থাকে। শিশুদের প্রাণখোলা হাসি বা তাদের খুনসুটিগুলো বা তাদের আচমকা আদর; এই সব কিছু মিলে আপনার পৃথিবী একটু একটু করে রঙিন হয়ে ওঠে। শিশুদের বড় হয়ে ওঠা, ওদের প্রতি পদে নতুন কিছু আবিষ্কার করা; এই সব কিছু মিলেই আপনার জীবন পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। 

আমার এই ছেলেটা হাসি, আনন্দ এবং শিশুসুলভ আগ্রহে ভরপুর। ওর চোখে ওর মায়ের মতই নীল। খুব মিষ্টি এবং হাসিখুশি ছেলে ও। ওর জন্য আমিই ওর বাবা আর ও আমাকে তেমন ভাবেই ভালোবাসে আর ভরসা করে। ওর বড় হয়ে ওঠার প্রতিটা ধাপে আমি ওর পাশে থাকব, এ’টা নিশ্চিত। 

ও বড় হয়ে কী হতে চায়? সে’টাই একান্তই ওর নিজের ব্যাপার। তবে হ্যাঁ, আমার প্রত্যেক ছেলেই জানে মেয়েদের কী ভাবে সম্মান করা উচিৎ। আমার ছেলেরা প্রত্যেকে নিজের মায়দের জন্য দরজা খুলে দেয়, চেয়ার টেনে দেয় বসার আগে, খাবারদাবার আগে মায়ের পাতে সার্ভ করে আর সম্মানের সঙ্গে কথা বলে। আর মেয়েদের কী ভাবে সম্মান করতে হবে, সে’টা শেখানোর দায়িত্বও আমার। এই ছেলে আমার কাছে ঈশ্বরের আশীর্বাদের চেয়ে কম নয় এবং আমি আপ্রাণ চেষ্টা করছি নিজের দায়িত্ব ভালভাবে পালন করতে। 

পুরুষ আর নারীর একে অপরের প্রতি সম্মান থাকাটা যে কোনও সংসারের জন্যই জরুরী আর এই ব্যাপারটার গুরুত্ব আমি নিজে বুঝতে পারি আমার বাবা মায়ের কাছ থেকে। আমার বাবা মা আমাকে বা আমার ভাইবোনদের যেমন ভালোবাসতেন, তেমনই তাঁদের নিজেদের মধ্যেও ছিল গভীর ভালোবাসা ও বিশ্বাস। আমরা কখনও তাঁদেরকে আমাদের সামনে ঝগড়া বা তর্ক করতে দেখিনি। “আদর্শ বন্ধু” বলতে আমরা যা বুঝি, আমার বাবা মা ঠিক তাই ছিলেন। নারীদের কী ভাবে সম্মান করতে হয়, সে’টা আমি শিখেছি আমার বাবার কাছ থেকে। আর হ্যাঁ, আমার বাবা কিন্তু আমায় এ’সব কিছুই বলে কয়ে শেখাননি, তিনি আমায় শিখিয়েছেন নিজের কাজের মধ্যে দিয়ে।

আমিও আমার ছেলেদের সে’ভাবেই শেখাতে চেষ্টা করি। ওরা দেখে আমি জেনিফারের সঙ্গে কেমন ভাবে ব্যবহার করি। ওরা দেখে আমি ওদের বোনেদের সঙ্গে কেমন ভাবে ব্যবহার করি। ওরা দেখে আমি প্রতিটা নারীর সঙ্গে কতটা  সমীহ এবং সম্মানের সঙ্গে কথা বলতে চেষ্টা করি। এবং আশা করি আমার ছেলেরাও সে’গুলো শিখছে। ওরা বড়দের সঙ্গে নম্র ও শান্ত হয়ে কথা বলে।  অন্যদের জন্য দরজা খুলে দেয়। মেয়ে বন্ধুদের সঠিক সম্মান দিতে শিখেছে ওরা। 

আমার ছেলেরা কি ভাই বা বোনেদের সঙ্গে ঝগড়া করে না? মাঝেমধ্যেই করে এবং বেশ সাংঘাতিক ভাবেই করে। তবে যখন বোনের সঙ্গে ঝগড়া করে তখন মাত্রাটা অন্য থাকে। আসল ব্যাপার হচ্ছে নারী পুরুষের যে স্বাভাবিক তফাৎগুলো, সে’গুলোর প্রতি  শ্রদ্ধাশীল হওয়া। 

আমার মেয়ে একবার ওর মাকে বলেছিল যে আমরা ওর দৃষ্টিভঙ্গি এমন ভাবে গড়ে তুলেছি যে সঠিক পুরুষ খুঁজে পেতে ওকে বেশ সমস্যায় পড়তে হবে। আমি বলি, দৃষ্টিভঙ্গি পালটে যাওয়াটা খুব ভালো লক্ষণ। আমিও চাইব নিজের জীবন সঙ্গী খুঁজে নেওয়ার ব্যাপারে আমার মেয়ে খুঁতখুঁতে হোক, তেমন হলেই বরং ও নিজের আদর্শ জীবনসঙ্গী খুঁজে নিতে পারবে; আমাদের কোনও সাহায্য করতে হবে না। ও আমাদের চেনে আর ও জানে কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল। 

আমি আর আমার বাবা দু’জনেই মেরিন কর্প্সে ছিলাম। মেরিন কর্প্সে শেখানো হত আত্মসম্মান, সাহস আর দায়িত্বের ব্যাপারে।  সে’খানেই শিখেছিলাম যে সবলের উচিৎ দুর্বলকে রক্ষা করা। আর শিখেছিলাম যে সবার ওপরে ঈশ্বর, তারপর পরিবার আর তারপর কর্প্স; আমি আজীবন সে’টা মনে রেখে সমস্ত কাজ করেছি। 

আমাদের বিয়ের প্রায় একুশ বছর হতে চলল। আমরা আমাদের বিয়ের প্রতিশ্রুতি ভুলিনি, আর আশা করি কোনও দিন ভুলব না। সুসময় হোক বা দুঃসময়; আমরা একে অপরের পাশে থাকবই। চিরটা কাল। 

যখন আমি আমার ছেলের চোখের দিকে তাকাই, আমি দেখতে পাই সারল্য আর বিশ্বাস । দেখতে পাই একরাশ ভালোবাসা। ও আমার ছেলে, আমি ওর বাবা। আমায় ও বাবা বলে ডাকে। জীবনে এর চেয়ে কোনও সুন্দর অভিজ্ঞতা হতে পারে কি? আমার মনে হয় না। পৃথিবীর অন্য কোনও সুখের জন্য আমি এই আনন্দকে ত্যাগ করতে পারব না। 

আর হ্যাঁ, সব শেষে একটা কথা বলা দরকার। ২০১৪র জানুয়ারিতে জেনিফারের ওপর এই আক্রমণ ঘটে। এর পর ওকে বেশি কিছুদিন পোস্ট-ট্রমাটিক এপিলেপ্সিতে ভোগে ফলে ওকে একটানা বিশ্রামে কাটাতে হয়। আমাকেও বেশ কিছু দিন কাজ ছেড়ে থাকতে হয় জেনিফারের যত্ন নেওয়ার জন্য। কাজেই সেই সময় পারিবারিক আয় এক ধাক্কায় অনেকটা কমে যায়। তখন আমাদের কিছু বন্ধু আমাদের জন্য gofundme account শুরু করে যাতে আমাদের অভাব কিছুটা হলেও দূর করা যায়। তখন যারা যারা আমাদের সাহায্য করেছেন,তাঁদের প্রতি রইল আমাদের অসীম কৃতজ্ঞতা।  অনেকে হয়ত আর্থিক সাহায্য করতে পারেননি কিন্তু আমাদের জন্য প্রার্থনা করেছেন এবং আমাদের নানা ভাবে উৎসাহ দিয়েছেন। আপনারা সকলে মিলে আমাদের সাহস যুগিয়েছেন দুঃসময়ের সঙ্গে লড়ে যাওয়ার, আমাদের অনুপ্রেরিত করেছেন এগিয়ে যেতে। আপনাদের মঙ্গল হোক। 

Translated by Tanmay Mukherjee

loader