“চেষ্টা করেও গৃহস্থালির আরাধ্য দেবী হতে পারলাম না” – মনখোলা আলোচনায় অনুজা চৌহান।

রূপকথার গল্পে যাই লেখা থাকুক না কেন, কর্মক্ষেত্রে প্রত্যেক সফল মহিলাই জানেন যে জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে একই রকম সাফল্য অর্জন করা অসম্ভব। কর্পোরেট জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করা নারী এবং সাফল্যের পোস্টার লেডি ইন্দ্রা নূয়ী থেকে সাধারণ দশটা পাঁচটার লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া নারী; সকলেই এ’টা জানেন যে কঠিন সিদ্ধান্তগুলো এড়িয়ে গেলে সফল হওয়া অসম্ভব, সকলেই বোঝেন যে একদিকে নিজেকে সঁপে দিতে হলে অন্য কোনও দিকে রাশ টানতে হবেই। তবে ইন্দ্র নূয়ী আর সাধারণ চাকুরীজীবী নারীর যুদ্ধগুলো কিন্তু একই ধরণের, তফাৎ শুধু বাহ্যিক গ্ল্যামারে।

p dir=”ltr”>অনুজা চৌহানের নিজের কথায় ; “আমার কথা বাদ দিন, নারী, পুরুষ বা শিশু; কারুর পক্ষেই জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে সমান দক্ষতা দেখানো সম্ভব নয়। প্রত্যেক মানুষকে স্পষ্টভাবে বুঝে ও বেছে নিতে হবে তাঁর নিজের জীবনের অগ্রাধিকারগুলো”।

নিজের জীবনের ক্ষেত্রে অনুজার ভাবনাচিন্তা সব সময়ই স্পষ্ট ছিল এবং তিনি তার অগ্রাধিকারগুলো সম্বন্ধে সচেতন ছিলেন। তিনি সবচেয়ে এগিয়ে রেখেছিলেন নিজের সৃজনীশক্তিকে এবং নিজের সৃজনশীলতাকে সঠিক ভাবে প্রকাশ করতে পারাটাই তার মূল লক্ষ্য ছিল। অনুজা বলছেন; “আমি ঠিক করে নিয়েছিলাম যে বিজ্ঞাপনের চাকরীটার চেয়েও আমার কাছে জরুরী হচ্ছে আমার লেখালিখি। এবং এই ব্যাপারটা সহজ নয়, এর জন্য অনেক ক্ষেত্রে আমায় প্রমোশনের সুযোগও খোয়াতে হয়েছে”। এই কঠিন সিদ্ধান্তগুলো শুধু কর্মক্ষেত্রেই নিতে হয় না, বাড়ির কাজেও সমস্ত দায়ভার হাতের মোয়ার মত সহজ নয়। অনুজা জানাচ্ছেন “স্বামীর তুলনায় সন্তানদের সঙ্গে সামান্য বেশি সময় কাটানোর সিদ্ধান্তটা আমি সচেতন ভাবেই নিয়েছিলাম “।

তবে অনুজার সব চেয়ে বড় সিদ্ধান্ত ছিল গেরস্থালীর সামলানোর গুরুদায়িত্ব বাদ দিয়ে কর্মক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়া। অনুজার ভাষায়; “ঘর সামলানোর ভার অনেক আগেই আমি আমার পরিচারিকার হাতে ছেড়ে দিয়েছিলাম, সে আজ তেইশ বছর হয়ে গেল। তবে একটু আফসোস এখনও রয়ে গেছে। আমার মনে হয় ঘর সামলানোর ব্যাপারেও আমি সহজেই দশভুজা হয়ে উঠতে পারতাম, তবে সে সময়টুকু জোটাতে পারলাম কই”; সহজ স্বীকারোক্তি অনুজার।

জেডাব্লুটি ইন্ডিয়ার হয়ে সতেরো বছর বিজ্ঞাপনের জগতে কাজ করেছে অনুজা এবং তাঁর সাহিত্যচর্চার শুরু ২০১০ সাল থেকে। অনুজার প্রথম উপন্যাস “দ্য জোয়া ফ্যাক্টর”য়ের জন্য তিনি   কসমোপলিটান পত্রিকা(ভারত)য়ের পক্ষ থেকে India’s Fun Fearless Female (সাহিত্য) সম্মানে ভূষিত হন। একই উপন্যাসের জন্য অনুজা ইন্ডিয়া টুডের তরফ থেকে ইন্ডিয়া টুডে নারীর সম্মানলাভ করেন (Woman Storyteller বিভাগে)। এখন তিনি ব্যস্ত তাঁর পঞ্চম উপন্যাস “বাজ”য়ের প্রচারে। ১৯৭১য়ের যুদ্ধের পটভূমিতে একটা টানটান প্রেমের কাহিনী নিয়ে এই উপন্যাস। বাজারে কানাঘুষো শোনা যাচ্ছিল যে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অভিযানের মত গুরুগম্ভীর বিষয়টা হয়ত অনুজার কলম সামাল দিতে পারবে না কিন্তু বইয়ের হুহু বেগে বিক্রি কিন্তু সে অন্য কথা বলছে। পাঠকরা বইটাকে ভালবেসেছেন এবং একজন লেখকের জন্য সে’টাই সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

অনুজার তিন সন্তান, একুশ বছরের নীহারিকা, উনিশের নয়নতারা আর ষোলো বছর বয়সের দৈবিক। তিন জনের কৈশোরকে প্রায় একই সঙ্গে সামলাতে হয়েছে অনুজাকে। ছেলেমেয়েদের বড় হয়ে ওঠার সময় মূলত তিনটে দিকে সবসময় খেয়াল রেখেছেন অনুজা। কোন তিনটে দিক? জেনে নেওয়া যাক:

১। স্থৈর্য এবং সামঞ্জস্য: নিয়ম দুমদাম পালটে যেতে পারে না। ছেলেমেয়েকে যদি কোনও নিয়ম বাতলে দেন, তাহলে সে নিয়মে সহজে শিথিল করে দেওয়া কিছুতেই চলবে না। ছেলেমেয়েরা জানুক যে আপনি নিয়ম ও অনুশাসনের ব্যাপারে দৃঢ়চিত্ত। আপনার তৈরি করা নিয়ম যদি আপনারই দুর্বলতা সুযোগ নিয়ে পালটে ফেলা যায় তাহলে জানবেন ছেলেমেয়ের সমীহ আপনি ক্রমশ হারাতে শুরু করেছেন। ওদের বুঝতে দিন যে আপনি যা বলেন,সে’টা আপনি অন্তর থেকে বিশ্বাস করেন এবং সেই মতই কাজ করেন।

২। কথাবার্তা বলা: ছেলেমেয়ের সঙ্গে বাবা-মায়ের খোলাখুলি কথাবার্তা হওয়াটা খুব দরকারি। আর কথাবার্তা যেন দায়সারা ভাবে না ঘটে, দুই পক্ষই যেন মন দিয়ে অন্যের কথা শোনে এবং গুরুত্ব দেয়। কথাবার্তার মধ্যে দিয়ে নিজেদের যাবতীয় অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়াটাও দরকারি।

৩। সততা: নিজের সন্তানকে কখনও মিথ্যে বলবেন না। তাদের সামনে এমন ভাব করারও কোনও দরকার নেই যে আপনি নির্ভুল নিখুঁত নিষ্পাপ একজন মানুষ এবং ছোটবেলায় আপনি সমস্ত ভুল এড়িয়ে চলতে পেরেছেন; কারণ সে’টা অসম্ভব। ওদের আপনার ভুলের থেকে শিক্ষা নিতে দিন, সাফল্যের থেকে শিক্ষা নেওয়ার চেয়ে ভুল চিনতে শেখা অনেক বেশি কাজের ব্যাপার। আপনার ভুল থেকে ওরা এ’টাও জানবে যে ভুল মানে দুনিয়াটা অন্ধকার হয়ে যাওয়া নয়, কাজেই ওদের নিশ্চিন্তে নিজের কথা বলুন। মন খুলে জানান আপনি ধোয়া তুলসী পাতাটি নন। আর হ্যাঁ, নিজে যা করতে পারবেন না, সে কাজ নিজেদের ছেলে মেয়েদেরও করতে বলবেন না। আপনি চান যে আপনার ছেলেমেয়ে সিগারেট ছোঁবে না, পর্নোগ্রাফি দেখবে না আর গাড়ি আস্তে চালাবে? তাহলে আপনি নিজের সিগারেট খাওয়া, পর্ন দেখা আর হুড়মুড় করে গাড়ি চালানো সবার আগে বন্ধ করুন।   

এগুলো বাদে দু’টো ব্যাপার অনুজা এড়িয়ে থেকেছেন সব সময়। ওর ভাষাতেই বলতে গেলে:

১। ধর্ম: আধ্যাত্মবাদ ব্যাপারটা ছেলেমেয়েদের নিজের মত করে বুঝে নিতে দেওয়াটাই ভালো। আপনার নিজের ধ্যানধারণা শিশুদের মাথায় চাপিয়ে তার বোঝা বাড়িয়ে তেমন লাভ নেই।  আমার স্বামী মনেপ্রাণে একজন খ্রিষ্টান কিন্তু ছেলেমেয়েদের মধ্যে তেমন কিছু কখন আরোপিত   হয়নি। আমি আমার ছেলেমেয়েদের মধ্যে সমস্ত ধর্মের প্রতি সম্ভ্রম গড়ে তুলতে পেরেছি আর তা’তে আমিও খুশি এবং আমার ছেলেমেয়েও নিশ্চিন্ত। যদিও এ বিষয়ে আমার বরের সঙ্গে আমার তর্ক চলতেই থাকে।

২। যৌনতা বোধ: ছেলেমেয়েরা তাদের নিজস্ব রুচি ও পছন্দের পক্ষে জোর সওয়াল করতে পারে। এবং বিভিন্ন বিষয়ে তারা অনেক সচেতন ও উদার; যেমন বহুগামিতা বা নারীপুরুষ বিভেদ সম্বন্ধীয় ব্যাপারে। অনেক ক্ষেত্রে বরং আমাদের মতামত অনেক বেশি সংরক্ষণশীল, আমরা অল্পেতেই আহা উঁহু  করে উঠি। কিন্তু তুলনায় ওরা অনেক বেশি সাবলীল। খাওয়ার টেবিলে বসে সমকামিতা বা অন্যান্য যৌনরুচী নিয়ে কথা বলাটা তাই চমকে ওঠার মত কোনও ব্যাপার নয়। কাজেই এই ব্যাপারগুলোতে আমরা স্বীকার করে নিয়েছি যে আমারা একটু সেকেলে আর ওদের আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

অনুজাকে ভালো না বেসে থাকা যায়? আর ওঁর বইগুলো  না পড়া থাকলে, এই বেলা চটপট পড়ে ফেলুন।

Translated by Tanmay Mukherjee

loader