নিজের বাচ্চার সঙ্গে এমন ভাবে খেলুন যাতে ও কাঁদে কম আর হাসে বেশি।

বাচ্চাকে খাওয়ানো, স্নান করানো বা ডাইপার বদলের কাজ তো রয়েছে। কিন্তু বাচ্চার ঘ্যানঘ্যান বা কান্না সামলানোর কাজটাও কম ঝক্কির নয়। বাচ্চার কান্না সামাল দিতে রোজ রোজই কি আপনাকে নতুন নতুন ফন্দিফিকির ভাবতে হচ্ছে? তাহলে বোধ হয় আপনার শিশুটি মন খুলে খেলাধুলো করতে পারছে না আর তাতেই জমছে চাপা বিরক্তি। এই বিরক্তির ফলে বাচ্চা শুধু খিটখিটে হয়ে উঠবে তা নয়, ওর স্বাভাবিক বেড়ে ওঠাও বিঘ্নিত হবে। এই প্রবন্ধে মায়েদের জন্য রয়েছে সেই সব খেলা আর অ্যাক্টিভিটির হদিশ যে’গুলো বাচ্চাদের আনন্দে আর ফুর্তিতে রাখবে। খেলাগুলো বাচ্চাদের বয়স অনুযায়ী ভাগ করে দেওয়া হয়েছে; তিন মাসের কম বয়সী বাচ্চারা, তিন থেকে ছয় মাস বয়স যাদের, ছয় থেকে নয় মাস বয়স যাদের আর নয় থেকে বারো মাস বয়সের যারা।   

( Smart Parenting থেক সংগৃহীত)

০ থেকে তিন মাস বয়স বয়স পর্যন্ত। 

এই বয়সের শিশুরা দিনের প্রায় বেশির ভাগ সময়ই ঘুমিয়ে থাকে। তবে ওরা যখন জেগে ওঠে, তখন ওদের সঙ্গে বিভিন্ন ভাবে খেলা যেতেই পারে। 

১। গানের সুরে দোলানো। 

এই সময় শিশুদের ইন্দ্রিয়গুলো সক্রিয় হতে শুরু করে। ওদের কোলে দুলিয়ে গান শোনালে ওরা আরও সজাগ হয়ে উঠবে। আর পাঁচটা চলতি ছড়ার গান দিয়েই শুরু করতে পারেন; সে’টা “আতা গাছে তোতা পাখি” বা “টুইঙ্কল টুইঙ্কল” যা কিছু হতে পারে। সঙ্গে থাকুক দুলুনি, বাচ্চাকে দোলানের সময় খেয়াল রাখবেন যাতে বাচ্চার ঘাড়ের নিচে আপনার হাত থাকে। কিছুদিনের মাথায় আপনার বাচ্চার নাম ধরেও গেয়ে উঠতে পারেন। 

২। ‘রাউন্ড অ্যান্ড রাউন্ড দ্য হে স্ট্যাক’। 

স্নানের পর বা ডাইপার বদলের পর যখন বাচ্চা চিত হয়ে শুয়ে থাকবে, তখন আপনার বাচ্চার থাইগুলো এমন ভাবে ধরুন যাতে আপনার বুড়ো আঙুলগুলো থাকে ওর হাঁটু-জোড়ার ওপর। তারপর ওর পা যত্ন করে ঘোরাতে থাকুন আর গাইতে থাকুন “রাউন্ড অ্যান্ড রাউন্ড দ্য হে স্ট্যাক গোজ দ্য লিটল মাউস। ওয়ান স্টেপস, টু স্টেপস, ইন দ্য লিটল হাউস” । গেয়ে যান আর বাচ্চার পা’দুটো সুরে সুরে ঘুরিয়ে যান, বার বার দিক পরিবর্তন করতে থাকুন। এ’তে আপনার শিশুর পায়ের মাংসপেশি মজবুত হবে আর ও আপনার সুর চিনতে শুরু করবে।  

৩। ঝুনঝুনির শব্দ। 

ঝুনঝুনির শব্দ শুনিয়ে খেলুন আপনার বাচ্চার সঙ্গে, এ’তে ওর শ্রবণশক্তি দ্রুত বিকশিত হবে। ব্যাপারটাকে এক ঘেয়ে না করে খেলার মত মজাদার করে তুলুন; ওকে খুঁজতে দিন শব্দটা কোথা থেকে আসছে। একবার ওর ডান কানের কাছে ঝুনঝুনিটা নিয়ে গিয়ে বাজান, কখনও বাঁ কানের কাছে আর কখনও বা মাথার ওপর, ও’কে উপভোগ করতে দিন। 

তিন থেক ছয় মাস বয়স পর্যন্ত। 

এই বয়সটা বেশ মজাদার। এখন আর বাচ্চারা গোটাদিন ঘুমিয়ে থাকে না। এই সময় ওর হাসি আর আদুরে ছটফটে গোটা বাড়ি আলোময় হয়ে ওঠে। তাই এখন আরও জমজমাট সব খেলার কথা ভাবা যেতেই পারে। 

৪। পুতুল খেলা। 

ছোট ছোট স্টাফড টয় ব্যবহার করে আর গান গেয়ে বাচ্চার সঙ্গে খেলায় মেতে উঠতে পারেন। হাতির স্টাফড টয় ব্যবহার করে গাইতে পারেন “হাতি নাচছে ঘোড়া নাচছে সোনামণির বিয়ে”।  বিভিন্ন জন্তুজানোয়ারের স্টাফড টয়ের সঙ্গে ভৌ ভৌ বা ম্যাও ম্যাও বা অন্য কোন শব্দে ডেকে উঠতে ভুলবেন না, সামান্য নেচে উঠলেও ক্ষতি নেই কোনও। 

৫। কথা বলা। 

এই বয়সের বাচ্চাদের মুখে দিয়ে ফুটে বেরোনো যে কোন শব্দই শুনতে অপূর্ব লাগে। ওর এলোমেলো শব্দগুলোর আদলে আপনিও ওর সঙ্গে এলোমেলো শব্দে কথা বলুন, ওকে উৎসাহ দিন আরও নতুন নতুন শব্দ আবিষ্কার করতে। মাঝেমধ্যেই ছোটখাটো প্রশ্ন ছুঁড়ে দিন ওর দিকে তাকিয়ে; “তারপর কী হল”? বা “তোমার বাবা কই”? সামান্য এই সব প্রশ্নের শিশুরা হরেক রকম শব্দে কথা বলার চেষ্টা করে। পারলে এগুলো রেকর্ড করে রাখুন কারণ স্মৃতি হিসেবে এই মুহূর্তগুলো অমূল্য। 

৬। হ্যান্ড স্পাইডার্স। 

বাচ্চাদের দৃষ্টিশক্তি বা অন্যান্য ইন্দ্রিয় শক্তির বিকাশে সাহায্য করার জন্য ওদের হাতে দামী মোবাইল ফোন বা ট্যাবলেট তুলে দেওয়ার কোনও দরকার নেই। আপনার হাতের কারিকুরিতেই অনেক রকম ভাবে খেলা সম্ভব। হাতটাকে শিশুর মুখের সামনে ধরে আঙুলগুলোকে বিভিন্ন ভাবে নাড়ুন, হাত ঘুরিয়ে নাচিয়ে বিভিন্ন ভাব ভঙ্গী করুন। অথবা সেই পুরনো ‘দুধ দিলাম ভাত দিলাম’ বলে সামান্য কাতুকুতু দেওয়ার খুনসুটি তো রয়েইছে। হাতের ছায়া দেওয়ালে ফেলে বিভিন্ন আকৃতি বানিয়ে বাচ্চাকে দেখান, এ’তেও সে খুব মজা পাবে। 

ছয় থেকে নয় মাস বয়স পর্যন্ত। 

ছয় থেক নয় মাস বয়সে শিশুরা কাছের মানুষদের চিনতে শুরু করে। বাড়ির লোকজনের সঙ্গে থাকতেই তখন সে বেশি পছন্দ করে। নিজের বাড়ির পরিবেশ সে বাড়তি স্বচ্ছন্দ বোধ করে। এই বয়সের বাচ্চারা অনেক বেশি ছটফটে আর তারা খেলাধুলো বেশ পছন্দ করবেই। 

৭। চিয়ারিং স্কোয়্যাড।

এই সময়ে বাচ্চারা বসতে শিখে যায়। বসে থাকার সময় ওদের হাত তুলে নাচিয়ে চীয়ারলীডারদের মত শব্দ করুন, এগুলো বাচ্চাদের খুব ভালো লাগবে। এমনকি ঘাড় মাথা নেড়ে এবং নানারকম শব্দ করে সে দিব্যি জানান দিতে পারবে যে সে কতটা উপভোগ করছে খেলাটা। 

৮। টুকি-বুকি ও লুকোচুরির রকম ফের।

ক্লিনিকাল সাইকোলজিস্ট জঁ পিয়াগেটের মতে আট মাস বয়স থেকে শিশুদের অবজেক্ট পার্মানেন্স বুঝতে পারে। অবজেক্ট পার্মানেন্স অর্থাৎ এ’টা বুঝতে পারা যে যা কিছু নজরের বাইরে আছে; তারও অস্তিত্ব থাকতে পারে। কাজেই এই সময় টুকি-বুকির মত ক্ষণিকের লুকোচুরি খেলাগুলো শিশুদের বেশ ভালো লাগবে। পাতলা স্বচ্ছ স্কার্ফ ব্যবহার করে নিজের মুখ ঢেকে ফেলুন, আপনার বাচ্চা সেই স্কার্ফ সরিয়ে দিতেই আপনি বলে উঠবেন ‘টুকি’। সহজ অথচ কী সুন্দর একটা খেলা। ওর চোখের সামনেই ওর প্রিয় খেলনা কম্বল বা বালিশের তলায় লুকিয়ে ফেলুন আর তারপর ওকে খুঁজে বের করতে দিন। 

৯। নৌকা বাওয়ার খেলা। 

বাচ্চারা বসতে শিখে গেলে এই খেলাটা জমবে ভালো। বাচ্চাকে মুখোমুখি বসিয়ে ওর দু’পাশে নিজের পা মেলে দিয়ে ওর দু’হাত ধরুন। তারপর সামান্য ঝুঁকে “হেইয়ো হেইয়ো হেইয়ো নৌকা বাও রে” বলে কল্পনার নৌকা বাইতে শুরু করে দিন। এ’তে ও বেশ মজা পাবে আর ওর পিঠের পেশিও মজবুত হবে। 

নয় থেকে বারো মাস বয়স পর্যন্ত। 

১০। হামা দেওয়া আর লুকোচুরি। 

এই বয়সে ছোটাছুটি করে লুকোচুরি খেলা সম্ভব নয় ঠিকই কিন্তু হামাগুড়ি দেওয়া শিশুর সঙ্গেও লুকোচুরি খেলাই যায়। চেয়ারের আড়ালে বা খাটের অন্য প্রান্তে গিয়ে বসুন আর আপনার বাচ্চাকে হামা দিয়ে এগিয়ে আসতে দিন আপনার দিকে। কাছে এলেই ওকে জাপটে ধরে চমকে দিন। দিব্যি মজার খেলা। 

১১। বল গড়িয়ে দেওয়া। 

যে কোনও বয়সের শিশুর জন্যেই বল খুবই ভালো খেলনা। বাচ্চাকে মেঝেতে বসিয়ে ওর দিকে বল গড়িয়ে দিন। ওকে বল ধরতে দিন, ছুঁড়ে ফেলতে দিন, ঠেলে দিতে দিন। নিজেই ওকে দেখান বলে লাথি কী ভাবে মারতে হয়। বল খেলার নেশা একবার পেয়ে বসলে ও বারবার খেলতে চাইবে। 

১২। মোজার বাস্কেটবল। 

শিশুদের হাত আর চোখের সমন্বয় গড়ে তোলা ওদের বড় হয়ে ওঠার একটা গুরুত্বপূর্ণ ধাপ আর এই খেলাটা এ বিষয়ে বেশ সাহায্য করে। পরিষ্কার মোজাকে দলা পাকিয়ে বলে বলের মত করে লন্ড্রি বাস্কেটে ছুঁড়ে ফেলুন, বাচ্চাকে সে’টা দেখিয়ে ছুঁড়ে ফেলতে শেখান। বিশেষত শিশুরা যখন সবে হাঁটতে শিখছে, তখন এই খেলাটা ওর জন্য আদর্শ। বাচ্চা যদি হাঁটতে নাও শিখে থাকে, আপনি ওকে ধরে দাঁড় করিয়ে এ’টা খেলাতে পারেন; ওর বেশ ভালোই লাগবে।  

Translated by Tanmay Mukherjee

loader