আমার বাচ্চাকে আমি কী’ভাবে এক বছর বয়সের মধ্যেই পটি ট্রেনিং দিয়েছি।

সন্তান মানুষ করা চাট্টিখানি কথা নয়। তবে ছেলেমেয়ে মানুষ করার ক্ষেত্রে কোনও একটা ব্যাপারে যদি আমি নিজেকে নিয়ে গর্বিত হই; তা’হলে সে’টা হল পটি ট্রেনিংয়ের বিষয়ে। আমারই অনেক বন্ধুবান্ধবদের দেখি তাঁরা তাঁদের বছর দুই বয়সের (বা তাঁর চেয়েও বেশি বয়েসের) বাচ্চাদের পটি ট্রেনিং দিতে হিমশিম খাচ্ছে।  তখনই আমার বাচ্চাদের পটি ট্রেনিংয়ের সাফল্যের কথা মনে করে আমার নিজের পিঠ চাপড়ে দিতে ইচ্ছে করে। অবশ্য আমি আপ্রাণ চেষ্টা করি আমার সেই বন্ধুদের পটি-ট্রেনিংয়ের বিভিন্ন টেকনিক বাতলে দিয়ে যতটা সম্ভব সাহায্য করতে।  

সেই টেকনিকগুলো নিয়ে আপনাদের সঙ্গে আলোচনা করার আগে একটা কথা স্পষ্ট করে দেওয়া দরকার। ট্র্যাডিশনাল আচারবিচার বা টোটকায় আমার আন্তরিক বিশ্বাস রয়েছে; বিশেষত সন্তানদের বড় করে তোলার ব্যাপারে। আমার তিন সন্তান; বড়টার বয়স দশ আর ছোট দু’জনের বয়স চার। আমার চারপাশের অনেক বাবা মাকেই দেখি যারা শিশুদের বড় করার ব্যাপারে বই, ইন্টারনেট বা ডাক্তারদের পরামর্শের ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু আমি আমার মা ঠাকুমাদের জ্ঞান বুদ্ধিতে ভরসা করেই বেশি লাভবান হয়েছি। ছেলেমেয়ে বড় করার ব্যাপারে গুরুজনদের ট্র্যাডিশনাল টিপস মেনে  চলতে গিয়ে আমায় কখনও ঠকতে হয়নি। আমার বাচ্চাদের রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা বেশ ভালো, খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে ওদের কোনও বায়নাক্কা নেই, ওরা শারীরিক ভাবে ফিট আর চনমনে আর ওর সকলেই এক বছর থেকে এক বছর দু’মাস বয়সের মধ্যে পটি ট্রেনড হয়ে গেছে।   

আমার কিছু কিছু পরামর্শ সেকেলে এবং হাস্যকর ঠেকতে পারে, এমনকি সস্তা মনে হওয়াও আশ্চর্যজনক নয়। তবে বিশ্বাস করুন বাচ্চাদের সময় মত পটি ট্রেন করাতে এই পদ্ধতিগুলোর জুড়ি মেলা ভার। আর বাচ্চারা একবার পটি ট্রেনড হয়ে গেলে আপনার অনেকটা চাপও কমে যাবে; কাপড়জামা কাচা ধোয়া শুকোনোর ধকল অনেকটা কমবে, ডাইপারের খরচ এক ধাক্কায় অনেকটা কমে যাবে, বিছানার চাদর আর অপরিষ্কার থাকবে না এবং সবচেয়ে বড় কথা ন্যাপি-র‍্যাশ থেকে মুক্তি। এ’বার বলি বাচ্চাদের পটি ট্রেন করতে আমি ঠিক কী কী করেছিলাম। 

পটি ট্রেনিং শুরু করার আগে কিছু ব্যাপারে আপনাদের খেয়াল রাখতে হবে। এক বছরের কম বয়েসের বাচ্চাকে পটি ট্রেন করাতে সময় বেশি লাগে ঠিকই কিন্তু বাচ্চা একবার শিখে গেলে আর কোনও চিন্তা থাকবে না। শেখানোর সময় মাঝে মধ্যেই হয়ত আপনার হয়ত মনে হবে ক্লান্তি আপনাকে গ্রাস করছে অথবা কখনও স্রেফ আলসেমিতে আপনি পিছিয়ে আসতে চাইবেন। কিন্তু পটি ট্রেনিংয়ে হাল ছাড়লে চলবে না; একাগ্র চিত্তে আপনাকে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবেই। 

আমার এই পদ্ধতিতে শিশুদের পটি ট্রেনিং শুরু করাতে হবে ওদের ছয় মাস বয়স থেকে (বা যে সময় থেকে ওরা নিজে থেকে বসতে শেখে)। সব বাচ্চাই নিজের মত করে বড় হয়, এক একটা জিনিস এক এক জন বিভিন্ন বয়সে গিয়ে শেখে। যেমন ধরুন আমার ছেলে পাঁচ মাস বয়সে বসতে শিখে গেছিল কিন্তু আমার দুই মেয়ে বসতে শিখেছিল সাত মাস বয়সের মাথায়। প্রথম যে ব্যাপারটা আপনার খেয়াল রাখতে হবে সে’টা হল শিশু কতক্ষণ অন্তর মল-মূত্র ত্যাগ করে। ভালো করে খেয়াল করলে দেখতে পাবেন যে শিশুদের মূত্রত্যাগ মোটামুটি একটা নিয়ম মেনেই হয়; এই ধরুন প্রতি দুই বা তিন ঘণ্টায় একবার। 

শিশুর মলমূত্রত্যাগ কতক্ষণ অন্তর হয় সে’টা বুঝে গেলেই আপনি পটি ট্রেনিং শুরু করাতে পারবেন। ধরুন শিশুর প্রথম মূত্রত্যাগ হয়েছে সকাল সাতটায়। ওর ডাইপার বদলে ঘড়ির দিকে চোখ রাখুন। সকাল ন’টা নাগাদ আপনার বাচ্চাকে বাথরুমে নিয়ে যান আর পটি সীটের ওপর বসিয়ে দিন। বাচ্চাকে ভালো ভাবে ধরে রেখে বাথরুমের বেসিন বা অন্য কোনও কল চালিয়ে দিন। জেনে রাখুন জলের শব্দে মূত্রত্যাগের ইচ্ছে তৈরি হয়; শুধু শিশুদের নয়, বড়দেরও। এ নিয়ে কোনও গবেষণা হয়ত হয়নি কিন্তু এ’র সত্যতা আমি নিজে যাচাই করেছি। কোনও হোটেলে বা রেস্তোরাঁয় বাথরুমে ব্যবহারের প্রয়োজন অনেক বেশি বেড়ে যায় যদি আশপাশ থেকে কোনও ফোয়ারার শব্দ একটানা কানে আসে। 

এই ভাবে একটানা চেষ্টা করার পরই দেখতে পাবেন যে আপনার বাচ্চা সাড়া দিতে শুরু করেছে। আমার ছেলেকে অবশ্য পটি সীটে সহজে বসাতে পারতাম না, ওকে তুলে ধরতে হতে এমন ভাবে যাতে ওর ইউরিন সঠিক জায়গায় পড়ে। একটু পড়ে সে’টাতেও সমস্যা হওয়ায় ওকে বাথরুমের এক কোণে নিয়ে গিয়ে তুলে ধরতাম ড্রেনের ফুটোর কাছে। তারপর জল দিয়ে বাথরুমের মেঝে ভালো করে ধুয়ে নিতে হত। 

মলত্যাগের ব্যাপারেও একই রকম ভাবে চেষ্টা করতে হবে। তবে এ’টা মূত্রত্যাগ অভ্যাস হওয়ার মাস দুয়েক পর থেকে শুরু করা ভালো কারণ তদ্দিনে আপনার বাচ্চা নিয়মিত বাথরুমে যাওয়া আর জলের শব্দে অভ্যস্ত হয়ে পড়বে। বাচ্চার খাওয়াদাওয়ার প্যাটার্নটা খেয়াল করবেন; কিছু খাবার সহজে পটি হতে সাহায্য করে। যেমন আমি খেয়াল করে দেখেছিলাম প্যাকেটের বেবিফুড হজম হতে সব চেয়ে বেশি সময় নেয়। বরং ঘরে তৈরি খাবার শিশুরা চটজলদি হজম করে নিতে পারে। ছ’সাত মাস বয়সের মাথায় শিশুরা দিনে দুই থেকে তিনবার মলত্যাগ করে থাকে, অথবা তার চেয়েও কম। এই সব ব্যাপারগুলো একটু খেয়াল করলেই পটি ট্রেনিং করানোর কাজ বেশ সহজ হয়ে যাবে। মূত্রত্যাগের মতই বাথরুমে গিয়ে মলত্যাগ করানোর পদ্ধতিটাও একই রকম হবে, শুধু জলের শব্দের প্রয়োজন পড়বে না। 

আর পটি ট্রেনিং ঠিকঠাক ভাবে করাতে হলে গোটা ব্যাপারটার সময় শিশুর সঙ্গে কথা বলে যাওয়াটা জরুরী। এই সময় কিছু শব্দ বারবার ব্যবহার করার চেষ্টা করুন যাতে আপনার বাচ্চা পটির সঙ্গে সেই শব্দগুলোকে জুড়তে পারে। প্রথম কয়েক মাস ট্রেনিংয়ের পর যখন শিশুর মুখে কথা ফুটবে তখন সে নিজেই সেই শব্দগুলো নিজের পটির প্রয়োজনের সময় ব্যবহার করতে চাইবে; হয়ত স্পষ্ট ভাবে বলতে পারবে না কিন্তু আধো আধো উচ্চারণে সেই শব্দগুলোকে বোঝাতে চেষ্টা করবেই। সে জন্যেই পটি ট্রেনিংয়ের সময় কয়েকটা শব্দকে বার বার ব্যবহার করুন যা’তে শিশুর মুখে বুলি ফুটলে সে নিজে সেই শব্দ ব্যবহার করে নিজের পটিতে যাওয়ার দরকারটা সহজে জানান দিতে পাড়বে। দেখবেন , একটু বড় হলে বাথরুমে যাওয়ার প্রয়োজনের কথা সে নিজে থেকেই আপনাকে বলতে পারছে

মনে রাখবেন; কাজটা সহজ নয়, মাঝে মধ্যে খুব কঠিন ঠেকতেই পারে কিন্তু হাল ছাড়বেন না। মন দিয়ে লেগে থাকাটা জরুরী। এবং মনে রাখবেন শিশুরা সবসময় অঙ্ক মেনে চলবে না; মাঝে মধ্যে দু’একটা দুর্ঘটনা হতেই পারে। যেমন ধরুন পটি ট্রেনিংয়ের পর ছেলেকে বাইরে নিয়ে যাওয়ার সময় আমি ভাবতাম যে বাথরুমে যাওয়ার দরকার হলে ও নিশ্চয়ই আমায় জানাতে পারবে। কাজেই ডাইপারও ব্যবহার করতাম না। অথচ মাঝেমধ্যে ও বাইরে গিয়ে সে নিজের প্যান্ট ভিজিয়ে দিত; আমার খুব রাগ হত, মনে হত ও স্রেফ দুষ্টুমি করার জন্য এ’সব করছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে ওরা শিশু। 

আমার একটা সহজ ব্যাপার বুঝে উঠতে একটু সময় লেগেছিল; এই বয়সের শিশুরা নিজেদের বাড়ির পরিবেশেই অভ্যস্ত থাকে, বাইরে গেলে তারা সামান্য ঘাবড়ে যাবেই এবং সদ্য শেখা নিয়ম কানুন গুলিয়ে যেতেই পারে। কাজেই ছোটখাটো গণ্ডগোলগুলো মানিয়ে চলতে হবে। অতএব বাড়ির বাইরে গেলে বাচ্চাদের ডাইপার পরিয়ে রাখাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।   

সব শেষে এ’টুকুই আবার বলব; অসীম ধৈর্য আর একটানা চেষ্টা; এই দু’টো খুব দরকারি যদি আপনি বাচ্চাকে এক বছর বয়সের মধ্যে পটি ট্রেন করাতে চান । শুভেচ্ছা রইল। 

Translated by Tanmay Mukherjee

loader