“একটা ছড়া শুনিয়ে দাও খোকা”; ভারতীয় বাবা-মায়েদের এমন ৭টা দাবী যা এখুনি বন্ধ করা দরকার।

“বাড়িতে কেউ এলে আমি ওকে গাইতে বলি কিন্তু ও এত জেদি যে কিছুতেই আমার কথা শুনবে না। লোকজন চলে গেলে সে আবার নিজের মনেই গাইতে শুরু করবে। আমি তো একদিন ওকে রীতিমত বকাবকিও করেছি কিন্তু তা’তেও কোনও লাভ হয়নি”, এই বক্তব্য একজন তিতিবিরক্ত মায়ের।

বাবা মায়েরা তাঁদের সন্তানদের ভালবাসবেনই, এ’তে কোনও অযৌক্তিকতা অবশ্যই নেই। কিন্তু ভারতীয় বাবা মায়েরা মাঝে মধ্যে বাড়াবাড়ি করে ফেলেন। বাড়াবাড়ি ওঁরা এতটাই করে ফেলেন যে  তাঁদের সন্তানদের ক্রমশ দম বন্ধ হয়ে আসে। শিশুরা ক্রমশ প্রবল চাপের সম্মুখীন হয় আর নিজেদের রাগ বিরক্তি সঠিক ভাবে প্রকাশ না করতে পেরে ওদের ব্যবহারও দিন দিন মন্দ হয়ে ওঠে।

এ লেখার শুরুতেই যে মায়ের বক্তব্যে তুলে ধরা হয়েছে সে’খানেই স্পষ্ট যে তিনি তাঁর সন্তানের ওপর কতটা জোর জবরদস্তি চাপিয়ে দেন এবং তা’তে তাঁর সন্তানের ওপর কী অমানুষিক চাপ পড়তে পারে সে’টাও সহজেই অনুমেয়। নীচের সাতটি উদাহরণ থেকে বোঝা যাবে যে কী ভাবে এ দেশের বাবা মায়েরা নিজের অজান্তেই নিজেদের ছেলে মেয়েদের অসহ্য চাপে ফেলে দেন।

১. “একটা গান শোনাও দেখি খোকা”।

বেশির ভাগ বাচ্চাই এ ধরণের দাবীর সামনে প্রথম দিকে বিচলিত হয়ে পড়ে। অনুরোধের মত শোনালেও এ’টা ক্রমশ হুকুমের হয়ে দাঁড়ায় আর বেশির ভাগ সময়ই এ’তে কাজের কাজ কিছু হয় না। বাচ্চাদের গান গাইতে বা নাচতে খারাপ হয়ত লাগে না তবে তারা শুধুমাত্র তাদের পছন্দের লোকের সামনেই নাচতে বা গাইতে স্বচ্ছন্দ বোধ করে (যেমন শুধু বাবা আর মায়ের সামনে)। বাড়ির বাইরের কারুর সামনে বা অপরিচিত কোনও মুখের সামনে অন্যের ইচ্ছে মত নাচতে বা গাইতে তার আপত্তি থাকতেই পারে। অতএব তাকে জোর করলে হিতে বিপরীত হতে পারে। নিজের সন্তানকে আগেভাগে জিজ্ঞেস করে নিন যে সে অতিথিদের সামনে গাইতে বা অন্য কিছু করতে চায় কিনা। তার ইচ্ছে থাকলে তবেই তাকে অতিথিদের সামনে গাইতে বা অন্য কিছু করে দেখাতে বলা উচিৎ। 

২। “ওকে কাকা/মামা বলে ডাকো”।

সংবাদ মাধ্যমে আজকাল প্রায়শই শোনা যায় শিশু নিপীড়নের বেদনাদায়ক সমস্ত ঘটনা। তা সত্ত্বেও বাবা মায়েরা যে কেন বন্ধুবান্ধব বা প্রতিবেশীদের শিশুর আত্মীয়স্থানীয় করে তুলতে চান কে জানে। পরিবারের সদস্যদের বাইরে কার সঙ্গে শিশুর সখ্যতা বা আত্মীয়তা গড়ে উঠবে সে’টা শিশুকেই ঠিক করে নিতে দিন। আপনার শিশু কাকে আপন করে কাছে টেনে নিচ্ছে সে দিকেও অবশ্য আপনার কড়া নজর রাখা উচিৎ।  আর আপনার সন্তান যদি কাউকে এড়িয়ে চলতে চায় বা ভয় পায় তাহলে জানতে চেষ্টা করুন ওর অনীহা বা ভয়ের কারণটা ঠিক কী। আপনার সন্তানের ওপর জোর না খাটিয়ে ওর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করুন। 

৩। “খোকা তুমি বসে থাকো, আমি আছি তো”। 

সন্তান সব বাবা মায়েরই নয়নের মণি কিন্তু অনেক সময় আমরা আদর আর আস্কারার তফাৎটা গুলিয়ে ফেলি। যেমন ধরুন খোকা বা খুকু বড় হওয়ার পরেও তার জন্য খাবার বেড়ে, তাকে খাইয়ে, তার পাত পরিষ্কার করা, এমনটা তো মাঝে মধ্যেই দেখা যায়। তাই নয় কি? কিন্তু খোকাখুকুকে আদরে রাখতে গিয়ে একটা বড় গোলমাল বাবা মায়েরা করে বসেন। যেমন এই ক্ষেত্রে যদি শিশু নিজের খাবার নিজে নিয়ে, খেয়ে, প্লেট সাফ করে রাখতে পারে তাহলে তার মধ্যে তৈরি হবে আত্মবিশ্বাস। এমনি ভাবে শিশুরা বড় হলে ওরা জীবন-যুদ্ধের জন্য ভালো ভাবে প্রস্তুত হতে পারবে এবং তাদের পরমুখাপেক্ষী হয়ে কাটাতে হবে না। 

৪। “ব্যানার্জীবাবুর ছেলে তোর চেয়ে এগজ্যামে অনেক বেশি নম্বর পেয়েছে”। 

অন্যের সঙ্গে তুলনা শৈশব থেকেই শুরু হয়ে যায়, এ’তে অস্বাভাবিক কিছু নেই। নবজাতকের ক্ষেত্রেও বাবা মায়েরা তাদের ওজন, উচ্চতা বা তাদের বাড়বাড়ন্তের তুলনা আকছার করে থাকেন অন্য শিশুদের সঙ্গে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তুলনার পরিধি বাড়তে থাকে। শিশুর নিজস্ব গুণগুলো কিছুতেই যেন যথেষ্ট মনে হয় না। বাবা মায়েরা সর্বক্ষণ শিশুর  মঙ্গল কামনা করে চলেছেন, এ নিয়ে কোনও দ্বিমত নেই। কিন্তু এই ভাবে তুলনা চাপিয়ে দিয়ে শাসন করার আখেরে লাভ নাও হতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় এ’টা বার বার প্রমাণিত হয়েছে যে পান থেকে চুন খসলে ছোটদের তিরস্কার করে তেমন লাভ হয় না। তার চেয়ে বরং সদর্থক উৎসাহে তাদের এগিয়ে চলার পথ সহজ হয়।  

৫। “লোকে কী বলবে”? 

কাকে কান নিয়ে গেলে কী হবে বা লোকে কী বলবে; এই চিন্তায় আমাদের দেশের বাবা মায়েরা সর্বক্ষণ মশগুল!

“ছেলে হয়ে খেলনা গাড়ি পছন্দ করে না? সে কী! লোকে কী বলবে? এ বাবা”!

“মেয়ে হয়ে শর্ট পরতে ভালোবাসে? আরে লোকে কী বলবে”?

যদি বছর দুয়েক বয়েসেই আমাদের খোকা খুকুদের এই ধরনের অদ্ভুত প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে ভাবুন কুড়ি বছর বয়সে পৌঁছে তাদের অবস্থা কতটা করুণ হবে। “লোকে কী ভাবল” এই চিন্তার বোঝা বয়েই তার জীবন কেটে যাবে হয়তো। 

৬। “তোমার জন্য কোনটা ভালো সে’টা আমিই সঠিক জানি কারণ আমি তোমার মা/বাবা”। 

এ’তে মনে মনে শিশু ভাবতে শুরু করে যে সে খুব কম জানে এবং কম বোঝে। ফলে বড় হয়েও সে নিজের সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পাবে এবং সর্বক্ষণ বাবা মায়ের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকবে যে কোনও সমস্যার মোকাবিলা করতে। সবচেয়ে বড় কথা এই ধরণের শাসনে বড় হলে শিশুরা প্রশ্ন করতে ভুলে যায় এবং এ’তে তাদের চরিত্র দুর্বল হয়ে পড়তেই পারে। 

৭। “ও তো একটা মেয়ে…ওকে সরি বলো”। 

অনেক সময় আমাদের দেশের বাবা মায়েরা ছেলে মেয়েকে সমান প্রতিপন্ন করতে গিয়ে ছেলে মেয়ের তফাৎটাকেই আরও প্রকট করে তুলে ধরেন। একটা বাচ্চা ছেলে একটা মেয়ে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলে যদি তাকে বলা হয় “সরি বলো কারণ ও একটা মেয়ে” তাহলে সেই খোকার দিকে ভুল ইঙ্গিত ছুঁড়ে দেওয়া হচ্ছে। সে শিখছে যে কাউকে ঠেলে ফেলাটা অপরাধ নয়, তবে একজন মেয়েকে ঠেলা উচিৎ নয় কারণ মেয়েরা দুর্বল। এর ফলে শিশুরা যখন বড় হয় তখন তারা ফেমিনিজমের মত চিন্তাধারাকে সম্যক ভাবে চিনতে পারে না। কাউকে মেয়ে বলে তার প্রতি দয়াদৃষ্টি নিক্ষেপ করতে হবে; এ ধরণের শিক্ষা না দিয়ে বরং শিশুকে শেখানো উচিৎ যে ছেলে মেয়ে দু’জনেই সমান।

Translated by Tanmay Mukherjee

loader