বাবা মায়ের ৯টা এমন অভ্যাস যা ছেলেমেয়ের জীবনকে ব্যর্থতার দিকে ঠেলে দিতে পারে

“বাবা মা হওয়া মুখের কথা নয়” – এ প্রবাদ বাক্য বোধ হয়তো অ্যাডাম আর ইভকেও শুনতে হয়েছে। কিন্তু বাবা মায়ের দায়িত্বগুলো ঠিক কী কী? শিশুদের তরতর করে বড় হয়ে উঠতে সাহায্য করা? ঠিক আর ভুলের তফাৎ চিনতে শেখানো? ভালো নাগরিক হিসেবে তাদের গড়ে তোলা? আদত উত্তরটা আদৌ এত সোজাসাপটা নয়। লিন্ডসে শ্যাফার বুঝিয়ে বললেন কারণটা।

পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন দায়িত্বগুলোর মধ্যে বাবা মায়ের দায়িত্ব বোধ হয় কঠিনতম। বাপ মা নিজেদের দায়িত্বটা সম্পূর্ণ বুঝে নিতে চেয়ে শিশুর জন্মের আগেই প্রচুর পড়াশোনা এবং গবেষণা করে রাখতেই পারেন; কিন্তু বাবামায়ের আদত শিক্ষা শুরু হয় ছেলেমেয়ে বড় হওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। বহু বাবামায়ের মধ্যে একটানা চাপা ভয় কাজ করে “আমরা কিছু ভুল করছি না তো”?

মোটের ওপর সব বাবামা মনেপ্রাণে চান যে তাদের সন্তান ভালোবাসায় বড় হবে, আনন্দে বড় হবে, সুস্থ থাকবে এবং সবচেয়ে বড় কথা; সফল হবে। কিন্তু সাফল্য অনেক ক্ষেত্রেই বিভিন্ন সামাজিক পরিস্থিতির উপর নির্ভরশীল। বাবামার অর্থনৈতিক অবস্থান, সামাজিক অবস্থান, যে পরিবেশে তাঁদের দৈনন্দিন জীবনযাপন; এই সমস্তই গভীর ভাবে প্রভাব ফেলতে পারে তাঁদের সন্তানের ভবিষ্যতে এবং তাদের সাফল্যে। বাবা মা হিসেবে ঠিক কী কী করলে ছেলেমেয়েরা সফল হবে, তার যদিও কোনও সহজলভ্য ফর্মুলা নেই কিন্তু তবুও রিসার্চ যে’টা প্রমাণ করেছে সে’টা হল বাবা মায়ের বিশেষ কিছু ব্যবহারের-আচার-আচরণের সঙ্গে ছেলেমেয়ের ভবিষ্যতের অনেক ভোগান্তির (যেমন অবসাদ বা উদ্বেগের) সুনিবিড় যোগাযোগ রয়েছে।

বৈজ্ঞানিকরা বাবা মায়ের আচারব্যবহারের ন’টি দিক চিহ্নিত করেছেন যেগুলোর কারণে তাদের সন্তানের জীবনে নেমে আসতে পারে ব্যর্থতা:

১। যারা স্বাধীনচেতা মানসিকতার বিরুদ্ধে

ভ্যান্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটির একটা গবেষণায় দেখা গেছে; যে বাবামায়েরা সবসময় সন্তানদের মানসিক ভাবে চাপে রাখেন; তাঁদের সন্তানরা প্রায়শই আত্মবিশ্বাসের অভাব এবং অপর্যাপ্ত আত্মসম্মানবোধে ভোগে। অন্যদিকে যে বাবামারা নিজের সন্তানদের স্বাধীন ভাবে বড় হয়ে ওঠার সুযোগ দেন, তাঁদের সন্তানরা জীবন যুদ্ধের জন্য ভালো ভাবে প্রস্তুত থাকে। নিজেদের মত করে যারা বড় হতে পেরেছে, তারা ইঁদুর দৌড়ের চাপও অনেকটাই সহজ করে নিতে পারে।

২। যারা নিজের সন্তানদের জীবনের ওপর অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ ফলিয়ে থাকেন

সন্তানদের জীবনের সঙ্গে নিবিড় ভাবে জড়িয়ে থাকা মন্দ নয় কিন্তু সমস্ত ব্যাপারে তাদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা আদৌ অভিপ্রেত নয়। এ’তে সন্তানদের মধ্যে সহজেই অবসাদ এবং উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। ২০১৩ সালে জার্নাল অফ চাইল্ড অ্যান্ড ফ্যামিলি স্টাডিজে প্রকাশিত একটা গবেষণায় দেখা যায় যে যে সন্তান বাবামায়ের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণে বড় হয়েছে তাদের অবসাদের বোঝা অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি; জীবনে আনন্দ খুঁজে পেতেও তাদের রীতিমত বেগ পেতে হয়।

৩।যারা চিৎকার চ্যাঁচামেচি করেন

অনেক শিশু যারা বাবামার কড়া শাসনে বড় হয় এবং যারা প্রতিনিয়ত ধমক এবং চিৎকার চ্যাঁচামেচি শুনতে অভ্যস্ত; তারা কিন্তু মোটেও ভালো থাকে না।  ইউনিভার্সিটি অফ পিট্‌সবার্গের গবেষণা বলছে অনেক ক্ষেত্রে এই সব শিশুরা চারিত্রিক সমস্যায় সম্মুখীন হয়। এদের বড় হয়ে বিষাদগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি থাকে।

৪। যারা স্বৈরাচারী পদ্ধতিতে বিশ্বাস করেন

ষাটের দশকে, মনোবিজ্ঞানী ডায়ানা বাউম্রিড তিন ধরণের “প্যারেন্টিং স্টাইল”য়ের প্রতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন; Permissive বা উদার, Authoritarian বা স্বৈরাচারী এবং Authoritative বা বিবেচক তত্ত্বাবধান। এর মধ্যে আদর্শ স্টাইল হচ্ছে Authoritative; যারা পরিশীলিত বিচারবুদ্ধি ও বিবেচনার মধ্যে দিয়ে  সন্তানদের বড় করেন। আর সবচেয়ে অনভিপ্রেত হচ্ছে Authoritarian স্টাইল – এ ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের চাহিদা সবসময় আকাশচুম্বী থাকে আর তাঁরা খোলাখুলি কথাবার্তায় আদৌ বিশ্বাস করেন না। এ ধরনের বাবামায়েরাই ছেলেমেয়েদের বলে থাকেন “তোমায় অঙ্কে নাইনটি পারসেন্ট পেতেই হবে, কেন পেতে হবে? আমি বলছি বলে পেতে হবে”! এ ক্ষেত্রে সন্তানরা আদৌ ঠাহর করতে পারে না যে তার বাবামার মূল চাহিদা ঠিক কী।

৫। যারা ছেলেমেয়ের পাশে বসে অনবরত মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন

জার্নাল অফ ট্রান্সিশনাল সাইকিয়াট্রিতে প্রকাশিত একটা রিপোর্ট অনুযায়ী ছেলেমেয়ের সঙ্গে থেকেও যখন বাবা মার মনঃসংযোগ অন্যদিকে থাকে, তখন সে’ ব্যাপারটা ছেলেমেয়ের ওপর কুপ্রভাব ফেলতে বাধ্য। বিশেষত বাবামায়ের টেকনোলজির আসক্তি (যেমন মোবাইল ফোন) সন্তানদের ওপর সুদূর প্রসারী কুপ্রভাব ফেলতে পারে।

৬। যারা শিশুদের একটানা টেলিভিশন দেখা নিয়ে আপত্তি করেন না

জার্নাল অফ পেডিয়াট্রিক্সে প্রকাশিত একটি রিপোর্ট বলছে যে তিন বছর বয়সের আগে যে শিশুরা অনবরত টেলিভিশনের সামনে বসে পড়ে তাদের কথাবার্তা আর সামাজিক রুচিবোধ দুইই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এ ধরণের শিশুরাই স্কুলে গিয়ে হম্বিতম্বি করে, হুলুস্থুল ঘটায়। অতিরিক্ত টিভি দেখার সঙ্গে মনঃসংযোগের অভাব, পড়তে না পারা বা অঙ্কের দুর্বলতার যোগাযোগ রয়েছে।

৭। যারা নির্লিপ্ত

অনেক রিসার্চ প্রমাণ করেছে যে বাবা বা মায়ের স্নেহের উষ্ণতা যে সব সন্তানদের জোটে না, তারা অনেক সময় নিরাপত্তাহীনতা এবং মানসিক টানাপড়েনে ভোগে, বিশেষত শৈশব ও কৈশোরে। যে শিশুরা বাবামায়ের থেকে স্নেহমাখানো কথাবার্তা শুনতে অভ্যস্ত নয়, তারা ক্রমশ অসামাজিক হয়ে পড়তে পারে এবং উদ্বেগজনিত অস্বস্তিতে ভুগতে পারে।

৮। যারা সন্তানদের মারধোর করে থাকেন

ছেলেমেয়েকে মারধোর করার ফলাফল নিয়ে সেই ১৯৮০ থেকে বিভিন্ন গবেষণা হয়েছে এবং বাবামায়ের মারধোরের সঙ্গে সন্তানদের মধ্যে অনভিপ্রেত উত্তেজনা এবং আগ্রাসী মনোভাবের যথেষ্ট যোগাযোগ পাওয়া গেছে। ২০১৬ সালে ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাসে, প্রায় ১৬০০০০ শিশুর ওপর একটা গবেষণার ফলাফলে  দেখা যায় যে মারধরের ফলে অনেক ক্ষেত্রেই শিশুদের মানসিক অসুস্থতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।  

৯। যাদের সন্তান নিজেই ঠিক করে নেয় সে কখন ঘুমবে

ইংল্যান্ডের গবেষকদের মতে শিশুদের ঘুমের বেনিয়মের সঙ্গে তাদের ব্যবহারের অসামঞ্জস্য, অসামাজিক মনোভাব আর মানসিক সমস্যাগুলোর সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। এছাড়া ঘুমের বেনিয়ম মগজকে প্রভাবিত করে। শিশুবয়সে ঘুমের গড়বড় পরবর্তী জীবনেও স্বাস্থ্যের ওপর অনভিপ্রেত প্রভাব ফেলতে পারে।

লেখাটা এ’খান থেকে নেওয়া:  DAVID WOLFE

Translated by Tanmay Mukherjee

loader