সিবিএসই, আইসিএসই, আইজিসিএসই, আইবি আর রাজ্য শিক্ষা পর্ষদের সিলেবাস: একটা তুলনামূলক আলোচনা

পড়াশোনার ব্যাপারে আজকালকার ছেলেমেয়েদের সামনে অনেক রকমের সুযোগ সুবিধে রয়েছে, রয়েছে বিভিন্ন রকমের সিলেবাস। তবে কোন সিলেবাস আপনার ছেলেমেয়ের জন্য আদর্শ হবে সে’টা আপনাকেই বুঝে নিতে হবে; এর নির্দিষ্ট কোনও ফর্মুলা নেই। ছেলেমেয়ের পড়াশোনার জন্য একটা  বোর্ড বেছে নেওয়ার আগে অনেক কিছু ভেবে নেওয়া দরকার; আপনার ছেলেমেয়ে ভবিষ্যতে কী হতে চায়, ওদের ব্যাপারে আপনারা কী ভাবছেন, ওদের আপনি পড়াশোনার জন্য বিদেশে পাঠাতে চান কিনা, চাকরীর সুবাদে মাঝেমধ্যেই ট্রান্সফার নিয়ে আপনাকে বিভিন্ন শহরে ঘুরে বেড়াতে হয় কিনা; এই সব। তাছাড়া অন্যান্য দিকও আছে; পড়াশোনার বাইরেও আপনার বাচ্চার অন্যান্য শখ আছে কিনা; যেমন নাচ, গান ইত্যাদি। আর সব চেয়ে বড় ব্যাপার হল কোনটায় কত খরচ আর আপনার সামর্থ্য; এ সব মিলিয়েই আপনাকে ঠিক করে নিতে হবে কোন বোর্ড বা স্কুল আপনার ছেলেমেয়ের জন্য আদর্শ। 

দেশের বিভিন্ন এডুকেশন  বোর্ড আর তাদের সিলেবাসের ভালোমন্দ দিকগুলো নীচে দেওয়া রইল: 

১। সিবিএসই (সেন্ট্রাল বোর্ড ফর সেকেন্ডারি এডুকেশন)

সুবিধেগুলো:

সিবিএসই স্কুল সংখ্যায় প্রচুর আর প্রায় সমস্ত জায়গায় রয়েছে। 

দেশ জুড়ে স্ট্যান্ডার্ড পাঠ্যবই সহজেই পাওয়া যায়। (এন সি ই আর টি)

দেশের বিভিন্ন কলেজ এন্ট্রান্সের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি হয়েছে সিলেবাস। 

সিবিএসইতে নথিভুক্ত নয় এমন স্কুলের ছাত্র বা প্রাইভেটে পড়া ছাত্ররাও সুযোগ পায় সিবিএসইর মূল পরীক্ষা দেওয়ার। 

সিলেবাসে অঙ্ক আর বিজ্ঞানের ওপর বাড়তি নজর রয়েছে। সাহিত্যে সামান্য পিছিয়ে। 

অনেক পরিবারকে মাঝেমধ্যে কর্মসূত্রে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়াতে হয়; সেই সমস্ত পরিবারের বাচ্চাদের জন্য এই বোর্ড আদর্শ কারণ গোটা দেশে সিলেবাস একই। 

ইঞ্জিনিয়ারিং আর মেডিকালে আগ্রহী ছাত্রদের জন্য আদর্শ। 

অসুবিধেগুলো: 

থিওরি নির্ভর পড়াশোনা। 

অঙ্ক আর বিজ্ঞান ঘেঁষা ১২য়ে পছন্দের বিষয়ের বদলে স্ট্রিম বেছে নিতে হয়; যেমন বিজ্ঞান, কমার্স, আর্টস ইত্যাদি। 

২। আইসিএসই (ইন্ডিয়ান সার্টিফিকেট ফর সেকন্ডারি এডুকেশন)

সুবিধেগুলো:

নিজের পছন্দমত পাঠ্যবই বেছে নেওয়া যায়। 

বোর্ডের সঙ্গে নথিভুক্ত নয়, এমন স্কুলের ছাত্ররা পরীক্ষায় বসার সুযোগ পায় না। 

সাহিত্য, আর্টস আর বিজ্ঞানে সমান গুরুত্ব। 

অনেক রকম বিষয় পড়ানো হয়, ছাত্ররা বিষয়গুলো থেকে ইচ্ছে মত বেছে নিতে পারে। 

প্রথাগত থিওরি শিক্ষার বাইরে যারা হাতেকলমে জ্ঞান অর্জনে ইচ্ছুক, তাঁদের জন্য আদর্শ। 

অসুবিধেগুলো:

হাতেকলমে জ্ঞান অর্জনের ব্যাপারে সিবিএসইর থেকে এগিয়ে বটে, তবে আইবি বা আইজিসিএসইর আরও এগিয়ে। 

সিবিএসইর চেয়ে আইসিএসইর সিলেবাস অনেক বড় আর কঠিন। 

সিবিএসইর তুলনায় অনেক বেশি বিষয় পড়তে হয়। 

৩। আই বি ( International Baccalaureate) 

সুবিধেগুলো:

আইবি’র সিলেবাসের সুখ্যাতি পৃথিবী জুড়ে। 

এই ক্ষেত্রে তিনটে বিভাগ রয়েছে; পি-ওয়াই-পি (প্রাইমারি ইয়ার্স প্রোগ্রাম – কেজি থেকে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত), এম-ওয়াই-পি (মিডল ইয়ার্স প্রোগ্রাম – ক্লাস সিক্স থেকে ক্লাস টেন পর্যন্ত) আর ডি-ওয়াই-পি (ক্লাস ইলেভেন, ক্লাস টুয়েল্ভ আর বিভিন্ন প্রোগ্রাম)

কোনও নির্দিষ্ট পাঠ্যবই নেই আর পড়াশোনা গতে বাঁধা নয় একেবারেই।

থিওরি মুখস্থের বদলে এখানে জোর দেওয়া হয় হাতে কলমে শেখার ওপর। 

ডিপি কোরে রয়েছে এক্সটেন্ডেড এস্যে, ক্রিয়েটিভ/অ্যাকশন/সার্ভিস প্রজেক্ট আর থিওরি অফ নলেজ।

ডি-ওয়াই-পি লেভেলে ছাত্ররা ছ’টা গ্রুপের মধ্যে থেকে যে কোনও বিষয় বেছে নিতে পারে, সঙ্গে থাকে ডিপি কোর।

যে বাবা মায়েদের কর্মসূত্রে দেশে বিদেশে ঘুরে বেড়াতে হয় বা যারা নিজেদের ছেলেমেয়েদের দেশের বাইরে গ্র্যাজুয়েশনের জন্য পাঠাতে চান, এই সিলেবাস তাঁদের বাচ্চাদের জন্য আদর্শ। 

অসুবিধেগুলো:

আমাদের দেশে এই সিলেবাস সদ্য এসেছে। 

আমাদের দেশের বিভিন্ন এন্ট্রান্স পরীক্ষাগুলোর সঙ্গে এই সিলেবাসের খুব একটা যোগাযোগ নেই। 

সিবিএসই বা আইসিএসইর স্কুলগুলোর তুলনায় এই স্কুলগুলোয় পড়াশোনা অনেক বেশি খরচা-বহুল। 

অন্যরকম সিলেবাস, তাই এ ক্ষেত্রে সহজে প্রাইভেট টিউটর খুঁজে পাওয়া মুশকিল। 

ছাত্ররা প্রাইভেটে এই পরীক্ষা দিতে পারে না। 

৪। আইজিসিএসই (International General Certificate of Secondary Education)

সুবিধেগুলো:

ক্লাস নাইন আর টেনের সিলেবাস আন্তর্জাতিক স্তরের। 

অনেক ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ক্লাস ১১ বা ক্লাসে ১২য়ে এই সিলেবাস ব্যবহৃত হয়। 

অনেক বেশি বিষয়ের মধ্যে থেকে নিজের পছন্দের সাবজেক্ট  বেছে নেওয়ার  থাকার সুযোগ থাকে ছাত্রদের জন্য। 

লিখিত আর মৌখিক; দু’ধরণের পরীক্ষাই নেওয়া হয়। 

সিলেবাসে জোর দেওয়া হয় হাতে কলমে শেখার ওপরে। 

কোর সাবজেক্টগুলো সবাইকে নিতে হয়। এ ছাড়া রয়েছে পাঁচটা গ্রুপ সাবজেক্ট যার মধ্যে থেকে একটা বেছে নিতে হয় ছাত্রদের ( যেমন অঙ্কের গ্রুপ, সাহিত্যের গ্রুপ ইত্যাদি)। 

যে বাবা মায়েদের কর্মসূত্রে দেশে বিদেশে ঘুরে বেড়াতে হয় বা যারা নিজেদের ছেলেমেয়েদের দেশের বাইরে গ্র্যাজুয়েশনের জন্য পাঠাতে চান, এই সিলেবাস তাঁদের জন্য আদর্শ। 

অসুবিধেগুলো: 

এই সিলেবাসে প্রাইভেট টিউটর খুঁজে পাওয়া কষ্টকর। 

সিবিএসই বা আইসিএসইর স্কুলগুলোর তুলনায় এই স্কুলগুলোয় পড়াশোনা অনেক বেশি খরচা-বহুল। 

৫। রাজ্য শিক্ষা পর্ষদ

সুবিধেগুলো:

বিভিন্ন রাজ্যের জন্য মানানসই ভাবে তৈরি বিভিন্ন সিলেবাস। 

অন্যান্য বোর্ডের চেয়ে কিছুটা হলেও সহজ। 

সিলেবাস তৈরি হয় সমাজের প্রতিটা স্তরের ছাত্রদের কথা ভেবে। 

বোর্ডের পরীক্ষায় নম্বর তোলা অপেক্ষাকৃত ভাবে সহজ। 

খেলাধুলো বা অন্যান্য বিষয়ে আগ্রহ থাকলে সহজেই এমন ভাবে সাবজেক্ট বেছে নেওয়া যায় যাতে পড়াশোনার চাপ কম থাকে। 

পরীক্ষায় নম্বর তোলা যেমন সহজ, তেমনই সিলেবাসের কড়া চাপ না থাকায় বিভিন্ন এন্ট্রান্স পরীক্ষার (যেমন আইআইটি বা জেইই) প্রস্তুতির জন্য বাড়তি সময়ও পাওয়া যায়। 

অসুবিধেগুলো:

অন্যান্য সিলেবাসের তুলনায় এই সিলেবাসের ব্যাপ্তি কম। বিশেষত ক্লাস টুয়েল্ভের পর বিভিন্ন এন্ট্রান্স পরীক্ষায় অসুবিধে হতেই পারে। 

প্রথাগত থিওরি শিক্ষার ওপর নির্ভরশীল সিলেবাস। 

বেশির ভাগ রাজ্যেই আঞ্চলিক ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক। 

যত মত তত পথ, যত পথ তত মাথা ব্যথা। কে কোন সিলেবাস বেছে নেবে, কোন বোর্ডে যাবে বা কোন স্কুলে ভর্তি হবে; সে নিয়ে নিশ্চিত হওয়া সহজ নয়। তবে আমাদের চারপাশে যারা সফল; তাঁদের সাফল্য বিশ্লেষণ করলে আমরা অনেক কিছু জানতে ও বুঝতে পারব। তবে আদত সাফল্য যে কী; সে নিয়েও তর্ক চলতে পারে। সাফল্য মানে কি গাদা গাদা নম্বর পেয়ে পরীক্ষা পাশ করা না শিক্ষাকে জীবন-যুদ্ধে কাজে লাগাতে পারা? এ নিয়ে ভাবনা চিন্তার অবকাশ আছে বৈকি। 

Translated by Tanmay Mukherjee

loader