এবার পুজোয় খাওয়াটাও ঐতিহ্যময় হয়ে যাক

দূর্গা পূজো ফিরে যাওয়ার সময় সেই সব ছোটবেলার ট্র্যাডিশনে | ষষ্ঠীর দিন মায়ের লুচি পরোটা খাওয়া, অষ্টমীতে খালি পেটে অঞ্জলি দেওয়া, নবমীতে জমিয়ে পাঁঠার মাংস ভাত খাওয়া, দশমীতে সবাইকে প্রণাম করে ১০৮ বার শ্রী শ্রী দূর্গা মাতা সহায় লেখা – দূর্গা পূজো সত্যিই ফিরে যাওয়া | কিন্তু এবার যদি দূর্গা পূজোর পাশাপাশি পেট পূজোর ক্ষেত্রেও ফিরে যাওয়া যায় সেই পুরোনো ট্র্যাডিশনে? বার্গার বা পিজার জায়গায় যদি ফিরে যাওয়া যায় ফাউল কাটলেট আর মোগলাই পরোটায়? খোঁজ রইলো কলকাতার পুরোনো সেই পুরোনো খাবার জায়গাগুলোর যা আজও স্বমহিমায় উজ্জ্বল |

অনাদি কেবিন

নিন্দুকের শেষ নেই কিন্তু কলকাতায় মোগলাই পরোটা বলতে এখনো লোকে অনাদি কেবিনই বোঝে | মজার ব্যাপার হল, যখন অনাদি কেবিন খুলেছিলো তখন কিন্তু কেবিন ব্যাপারটা ছিলোনা | কেবিন, মানে পর্দা-ঢাকা ছোট ছোট বসার জায়গাগুলো এসেছে অনেক পরে যখন বাঙালি বাবুরা প্রথম সপরিবারে এখানে আসতে শুরু করেন | তবে ‘ওপেন কিচেন’ ব্যাপারটা কিন্তু বাঙালিরা জেনেছে অনাদির পরোটা ভাজার খোলা কাউন্টার থেকে | আজও অনাদির সবথেকে জনপ্রিয় আইটেম হল হাঁসের ডিমের মোগলাই পরোটা যার সাথে থাকে ছোট ছোট টুকরো করে কাটা আলুর তরকারি, অল্প টমেটো সস, আর ঝিরিঝিরি করে কুচোনো পেঁয়াজ, শশা ও গাজরের স্যালাড | অন্য অনেক কিছুই আছে, কিন্তু ট্র্যাডিশন মানছেনই যখন, তাহলে নাহয় মোগলাই পরোটাই খান এখানে?

অ্যালেন’স কিচেন

যদিও নাম অ্যালেন’স কিচেন, এটি শুরু করেছিলেন জীবনকৃষ্ণ সাহা নামের এক আদ্যন্ত বাঙালি ভদ্রলোক, এবং আজ ১৩৭ বছর পরেও কলকাতায় আর কোনো জায়গা নেই যে অ্যালেন’সের চিংড়ির কাটলেটকে টক্কর দিতে পারে | এখানে মেনু খুব ছোট – খুব বেশি হলে খানবিশেক আইটেম পাওয়া যায় – এবং সবই চপ কাটলেট. কিন্তু তার মধ্যেও লোকের এক নম্বর পছন্দ আজও এদের প্রন কাটলেট | যদি একদিন একটু ডায়েট বা খুব স্বাস্থকর খাবারের কথা ভুলতে পারেন, এদের ঘিয়ে ভাজা প্রন কাটলেট খেয়ে দেখুন | না, ঘিয়ে ভাজা হলেও এতে মুখ মেরে যায়না | বরং ঝাঁঝালো কাসুন্দি ও বীট, শশা, পেঁয়াজের সালাডের সঙ্গে সার্ভ করা কাটলেটটি থাকে নরম ও প্রতি কামড়ে অসাধারণ |

মিত্র ক্যাফে

বাঙালির প্রিয় উত্তম কুমারের খুব পছন্দের জায়গা ছিল মিত্র ক্যাফে | প্রায় একশো দশ বছর পুরোনো ক্যাফেটির নতুন শাখা খুলেছে দক্ষিণ কলকাতাতেও কিন্তু উত্তর কলকাতায় শোভাবাজার মেট্রোর কাছে পুরোনো জায়গাটি এখনো সাবেকি খদ্দেরদের কাছে তুলনাহীন | এখানকার চপ কাটলেট এক সময় সারা কলকাতায় জনপ্রিয় ছিল যদিও এদের মেনুর এক নম্বর আইটেম আজও এদের ফিশ ডায়মন্ড কাটলেট | প্রায় ডায়মন্ড শেপে ভাজা কাটলেটটির পুর নরম মাছের কিন্তু বাইরেটা থাকে মুচমুচে এবং বিশেষ করে বর্ষাকালে এর জুড়ি মেলা ভার | সাথে থাকে ঝাঁঝালো কাসুন্দি ও স্যালাড | যদি ফিশ কাটলেট খেতে ইচ্ছে না করে, এদের মাটন কাটলেট খেয়ে দেখতে পারেন, বা আরেকটু সাহসী হতে চাইলে, ব্রেন চপও খেয়ে দেখতে পারেন |

রয়্যাল ইন্ডিয়ান হোটেল

চপ কাটলেটের চেয়ে একটু বেশি খেতে ইচ্ছে করছে? চলে যান চিৎপুরের রয়্যাল ইন্ডিয়ান হোটেলে | খেয়াল আছে ফেলুদা কি বলেছিলো? নেপোলিয়নের চিঠিতে এখানে বসে নলি হাড়ের ম্যারোটা সুরুৎ করে টেনে ফেলুদা বলেছিলো রয়্যালের বিরিয়ানিটা অনেক সময় ব্রেন টনিকের কাজ করে | ব্রেন টনিকের দরকার হয়তো আপনার পূজোর সময় হবেনা কিন্তু ভালো খাবারের স্বাদ পেতে বাঙালি চিরকালই পাগল | অনেক তো হল আরসালান, সিরাজ, আমিনিয়া – এবার গিয়েই দেখুন না এই একশো এগারো বছর পুরোনো রেস্তোঁরাতে? তবে একটা জিনিস – এখানকার বিরিয়ানিতে কিন্তু আলু বা ডিম্ কোনোটাই পাবেননা | কেন? কারণ এদের বিরিয়ানি তৈরী হয় সেই পুরোনো রাখবদারদের পদ্ধতিতে – নবাবের বিরিয়ানি করতো এই রাখবদাররা সুতরাং গরিব মানুষের আলু বা ডিম্ এতে পড়তো না | শুধুমাত্র মাংস দিয়েই হতো এই বিরিয়ানি, এবং সেপ্রথা আজও চলে আসছে | কিন্তু যদি আলু ছাড়া বিরিয়ানি খেতে মন না চায়, খেয়ে দেখুন এদের মাটন চাপ – দাবি ফেলে বলতে পারি, এর চেয়ে ভালো চাপ কলকাতায় পাওয়া মুশকিল |

গোলবাড়ি

আজকাল অনেকের বক্তব্য গোলবাড়ির কষা মাংসে বড্ড তেল হয়, বা খুব ঝাল দেয় এরা | কিন্তু বাঙালি কবে তেল-ঝালের পরোয়া করেছে? আর পূজোর সময়টাই তো হল নিয়ম ভাঙার | খেয়েই দেখুন না গোলবাড়ির কষা মাংস আর পরোটা! যারা মাটন খেতে চান না তাদের জন্যে চিকেন কষাও আছে বা হালকা খাবারে পাবেন নানারকম চপ কাটলেট | কিন্তু যদি চোখে জল আনা বাঙালি খাবার চেখে দেখতে হয়, অর্ডার করে ফেলুন গোলবাড়ির কষা মাংস | বসার জায়গা হয়তো পাবেন না কিন্তু মন ও পেট দুটোই ভরবে |

লক্ষী নারায়ণ সাউ এন্ড সন্স

তেলেভাজা আর নেতাজি – বাঙালির সত্তা এই দুটিতে বড় দুর্বল হয়ে পড়ে | নেতাজির ওপর কোনো কথা হয়না, আর তেলেভাজা? এটি ছাড়া বাঙালি হয়না | এবার পুজোয় খেয়ে দেখুন নেতাজির বড় পছন্দের তেলেভাজা | নেতাজি নিজে কখনো এখানে এসেছেন কিনা জানা নেই কিন্তু ওনার গোপন মিটিঙে এখান থেকে আলুর চপ, ফুলুরি, বেগুনি যেত | নেতাজি নিরুদ্দেশ হবার পরও কিন্তু লক্ষী নারায়ণ সাউ ওনার কথা ভোলেননি | আজও তেইশে জানুয়ারী এখানে বিনামূল্যে তেলেভাজা বিতরণ হয় | আর স্বাদ? বিকেল চারটের মধ্যে না পৌঁছলে তেলেভাজা পাবেননা – এদের স্বাদের টানে লোকের ভিড় আজও উপচে পড়ে |

প্যারামাউন্ট

পুজোয় অনেক হাঁটবেন, অনেক লাইনে দাঁড়াবেন, গলা শুকোতে বাধ্য | কিন্তু কুল ব্লু আর পার্পল ক্রাশ তো অনেক হল, এবার পুজোয় খেয়ে দেখুন ডাবের শরবত | কচি ডাবের শাঁস, ডাবের জল, বরফ আর চিনির সিরাপ মেশানো এই শরবত খুব প্রিয় ছিল আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের | মেঘনাদ সাহা থেকে দাবাড়ু সূর্যশেখর রায় পর্যন্ত এদের শরবতের ভক্ত | আপনিও খেয়ে দেখুন এই পুজোয় – আর জানুন কেন আজ নিরানব্বই বছর ধরে বাঙালির কাছে তেষ্টা মেটানোর একমাত্র জায়গা প্যারামাউন্ট |

Feature Image Source: Kolkata Dairies

loader