শিশুদের ঘুমপাড়ানি গল্প শোনাবার দিন কি শেষ হয়ে গেছে? ‘কহানিওয়ালি নানী’ চেষ্টা করছে শিশুদের সেই গল্প শোনার অভিজ্ঞতা ফিরিয়ে দেওয়ার!

সরলা মিন্নি হচ্ছেন ‘কহানিওয়ালি নানী’ বা গল্প-বলিয়ে দিদিমা এবং আর পাঁচটা দিদিমার চেয়ে কিন্তু সরলা একটু আলাদা। সরলার ভাবনা চিন্তায় আদ্যোপান্ত আধুনিক এবং টেকনোলজির ব্যাপারে রীতিমত স্বচ্ছন্দ। ইংরেজি এবং হিন্দী; দু’টো ভাষাতেই সরলার সমান দখল। এ ছাড়া সরলা নিজে অত্যন্ত ফিটনেস সচেতন এবং ঘড়ি ধরে সমস্ত কাজ করার ব্যাপারে তিনি যথেষ্ট তৎপর।

এই সব গুণের জন্যেই সরলা মিন্নির চার মাসের প্রজেক্ট ‘কহানিওয়ালি নানী’ ইতিমধ্যেই বেশ সাড়া জাগিয়েছে। সিনেমা টিভি ইন্টারনেটের যুগের ক্লান্ত বাবা মায়েরা সাদরে গ্রহণ করে নিচ্ছেন কহানিওয়ালি নানীর সহজ ভাষায় বলা নীতিমূলক গল্পগুলো। এই গল্পগুলোর ভাষা প্রাঞ্জল আর শিশুদের জন্য আদর্শ।

এ’টা কী ভাবে কাজ করে?

ওপরের ছবিতে দেওয়া হোয়্যাটস্যাপ নম্বরে একটা মেসেজ পাঠান

মেসেজ পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গে আপনার থেকে জানতে চাওয়া হবে আপনার শিশুর বয়স আর পছন্দের ভাষা। এই তথ্যগুলো দিয়ে নথিভুক্ত করলেই ‘কহানিওয়ালি নানী’র থেকে প্রতি সপ্তাহে আপনি পাবেন আপনার সন্তানের জন্য বাছাই করা দু’টো গল্প। প্রতিটা গল্প আসবে ৮ থেকে ৯ মিনিটের ভয়েস ক্লিপে। গল্পগুলো আপনার সন্তানের বয়স মাথায় রেখে বেছে নেওয়া এবং সেগুলো শোনানো হয়েছে এমন ভঙ্গিমায় যাতে আপনার শিশুর মনের কল্পনাগুলো ডানা মেলতে পারে।

সমস্ত কিছু বিশদে জানা যাক খোদ সরলা দেবীর থেকে।

১। ‘কহানিওয়ালি  নানী’র আইডিয়া আপনার মাথায় এলো কী ভাবে?

সরলা: আজকালকার শিশুদের মনোরঞ্জন বলতে ওই টেলিভিশন বা ভিডিও-গেম বা ইন্টারনেটে নানা রকমের ভিডিও, এই ব্যাপারটা আমার বেশ খারাপ লাগে। তাছাড়া আজকের যুগে অনেক শিশুদের সঙ্গে তাদের দাদু দিদারা থাকেন না, কাজেই তেমন ভাবে গল্প শোনানোর লোকও তাদের জোটে না। আমার এখনও মনে আছে আমার ছেলেমেয়েরা কতটা আনন্দ পেত যখন ওরা দাদু দিদার থেকে বিভিন্ন গল্প শুনত। আমার ভীষণ ইচ্ছে ছিল সমস্ত খোকাখুকুদের গল্প শোনাবার। আমার সব সময় মনে হত শুধু টিভি আর ইউটিউবের পাল্লায় পড়ে আজকাল ছোটবেলাগুলো ফিকে হয়ে যাচ্ছে, আবার শুধু টিভি বন্ধ করলেই তো চলবে না; শিশুদের গল্প শোনারও যে দরকার আছে। ইচ্ছে থাকলেও প্রথম দিকে আমি নিশ্চিত ছিলাম না কী ভাবে এই ব্যাপারে আমি কিছু করতে পারব। হোয়্যাটস্যাপে সবাইকে অডিও-স্টোরি পাঠানোর বুদ্ধিটা যোগায় আমার বোনের মেয়ে পারুল রামপুরিয়া, পারুলের সঙ্গেই আমার এই ‘কহানিওয়ালি নানী’র পথ চলা শুরু। মূলত ওর উৎসাহেই প্রথম আমার গল্প রেকর্ড করে আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবদের পাঠানো। সেই গল্প সবার খুব ভালো লাগে, সবার মতামতে উজ্জীবিত হয়েই আমরা ‘কহানিওয়ালি নানী’ শুরু করি ২০১৭ সালেরই ২১ মার্চ।

২। এই গল্পগুলো আপনি কী ভাবে যোগাড় করেন? কোথা থেকে?

সরলা: মূলত আমার গল্পগুলো বিভিন্ন লোককথার থেকেই নেওয়া। একই গল্প বিভিন্ন ভাবে বিভিন্ন জায়গায় বলা হয়েছে, আমি সেগুলো পড়ে চেষ্টা করি নিজের মত করে সাজিয়ে তুলতে যাতে সেগুলো ছোটদের জন্য চিত্তাকর্ষক হয়ে ওঠে। আমায় নিজেকেও প্রচুর পড়তে হয় গল্পের আইডিয়া পেতে বা সেই আইডিয়াগুলো নিয়ে আরও গল্প তৈরি করতে।

৩। আপনার গল্প শুনে অনেকে নিশ্চয়ই অনেক প্রতিক্রিয়া জানান, তেমন কিছু প্রতিক্রিয়ার কথা আমাদের জানান যেগুলো আপনার চিরকাল মনে থাকবে।

সরলা: আমি সম্প্রতি ‘বিট্টু’ নামে একটা গল্প রেকর্ড করে পাঠাই, সে’টার ব্যাপারে এক মা আমায় জানান “আপনার গল্পটির জন্য অনেক ধন্যবাদ। আমার মেয়ে ও’টা শুনে বলেছে ‘আরে এ’টা তো আমারই গল্প, নানী শুধু আমার নামটা পালটে বিট্টু করে দিয়েছে'”। এ’রকম বহু মতামত আমি পেতে থাকি। কাশ্মীরের প্রত্যন্ত অঞ্চল যেখানে ছোটদের জন্য স্কুলও নেই, সে’খানেও আমার গল্প পৌঁছেছে। সে’খান থেকে এক মা আমায় ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছেন “আপনার কণ্ঠস্বর দুর্দান্ত। কহানিওয়ালি নানীর কোনও তুলনা হয় না। চালিয়ে যান”। এ’ছাড়াও অনেক মেসেজ পাই। অনেক ছোটদের থেকে আমি ভয়েস মেসেজ পাই যে’খানে তারা আরও গল্পের আবদার করে, কেউ কেউ আমায় তাদের বাড়িতেও ডেকে পাঠায়’।

৪। এমন কোনও গল্প আছে যে’টা আপনি বার বার শোনান?

সরলা: আমি কোনও গল্পই এক বারের বেশি দু’বার বলি না।

৫। শিশুর বয়স অনুযায়ী আপনি নিজের গল্প সাজিয়ে নেন। এ’টা কী ভাবে করেন? আপনি কি গল্পের ভাষা ও বিষয় শিশুর বয়স অনুযায়ী ঠিক করে নেন?

সরলা: আমরা গল্পের ভাষাকে যতটা সম্ভব সহজ রাখার চেষ্টা করি। আর চেষ্টা করি গল্পগুলোকে এমন বিষয়ের ওপর দাঁড় করাতে যা’তে শিশুরা সহজেই সেগুলো বুঝে উঠতে পারে।

৬। এই মুহূর্তে কহানিওয়ালি নানীর গ্রাহক সংখ্যা কত?  পৃথিবীর কোন কোন প্রান্ত থেকে লোকে আপনার গল্প শুনছে?

সরলা: এ মুহূর্তে আমাদের গ্রাহক সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার এবং তাঁরা পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র ছড়িয়ে; যেমন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, হংকং, থাইল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, সুইজারল্যান্ড ইত্যাদি। আর ভারতের প্রায় সমস্ত রাজ্যে ছড়িয়ে রয়েছেন আমাদের গল্পের গ্রাহকরা।

৭। আপনার নাতির কেমন লাগে আপনার গল্পগুলো? ওর সবচেয়ে প্রিয় গল্পই বা কোনটা?

সরলা: আমার নাতির বয়স চার বছর। ও এক বছর বয়স থেকে আমার কাছে গল্প শুনছে আর গল্পগুলো ওর খুব পছন্দ। ওর সবচেয়ে প্রিয় গল্প কোনগুলো? ‘বিট্টু’ আর ‘এলিফ্যান্ট দ্য টেলর’।

৮। আপনার কি এই গল্পগুলোর ওপর কোনও কপিরাইট আছে? বই প্রকাশের কথা কখনও ভেবেছেন কি?

সরলা: আমার বলা গল্পগুলো সমস্তই বিভিন্ন লোককথা থেকে সংগৃহীত কাজেই সে’খানে কপিরাইটের প্রশ্ন নেই। আর এ মুহূর্তে কোনও বই ছাপানোর প্ল্যানও নেই।

৯। আপনার গল্পগুলো আপনি বিনামূল্যে বিলি করছেন। কেন?

সরলা: এই গোটা প্রজেক্টের মূলে রয়েছে আমাদের আবেগ আর শিশুদের প্রতি ভালোবাসা। আমাদের লক্ষ হচ্ছে শিশুদের কাছে এই গল্পগুলোকে পৌঁছে দেওয়া, তার বাইরে কিছু নয়।

১০। আপনি গল্পগুলোকে রেকর্ড কী ভাবে করেন? আপনার সামনে কোনও শিশু বসে আছে ভেবে গল্প বলে রেকর্ড করেন নাকি আগে লিখে নিয়ে তারপর পাঠ করে রেকর্ড করেন?

সরলা: আমি আগে একটা গল্প বেছে নিই, চেষ্টা করি তার বিভিন্ন সংস্করণ খুঁজে পড়াতে এবং তারপর সে’টাকে নিজের মত করে সাজিয়ে নিই। গল্পটা রেকর্ড করার সময় আমি মনে করি আমার সামনে আমার নাতি বসে রয়েছে আর আমি ওকে গল্প শোনাচ্ছি।

আপনার শিশুর জন্য নিত্যনতুন গল্প খুঁজে পেতে হলে, আজই মেসেজ পাঠান ‘কহানিওয়ালি নানী’কে।

Translated by Tanmay Mukherjee

loader