আপনি কি আপনার বাচ্চাকে ঘুম পাড়ানোর সময় ব্রেস্টফীড করাচ্ছেন? তা’হলে এ’টা আপনার অবশ্যই পড়া উচিৎ

যে কোনও মায়ের জন্যেই ব্রেস্টফীড করানোটা মাতৃত্বের অনুভূতিগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশ। যদিও ল্যাচিং (বাচ্চার মুখে সঠিক ভাবে নিপল দেওয়া), ব্রেস্টমিল্কের প্রবাহ; এই সব দিক সামাল দিয়ে ব্রেস্টফীডিংয়ের প্রথম দিনগুলো বেশ কঠিন হতে পারে। কিন্তু ক্রমশ এই ব্যাপারগুলো সহজ হয়ে আসে আর ব্রেস্টফীডিংয়ের অভিজ্ঞতাও হয়ে ওঠে সুন্দর। তবে একটা সময় আসে যখন মায়েরা বাচ্চাদের ব্রেস্টফীড করিয়ে ঘুম পাড়ানোর ব্যাপারে অপরাধবোধে ভুগতে শুরু করেন। শিশুর জন্মের পর প্রথম কয়েক মাস ব্রেস্টফীড করিয়ে ঘুম পাড়ানোর ব্যাপারটা অবশ্য স্বাভাবিক। কিন্তু বয়স বাড়ার পরেও যখন শিশুদের এই অভ্যাসটা রয়ে যায়, তখন অনেকের জন্য সে’টা চিন্তার কারণ হয়ে ওঠে। তবে পার্ফেকশনিস্টরা যাই বলুন না কেন, ব্রেস্টফীড করিয়ে ঘুম পাড়ানো মানেই যে ব্যাপারটা ক্ষতিকারক তা কিন্তু নয়।   

বাচ্চাকে ব্রেস্টফীড করিয়ে ঘুম পাড়ানোর কিছু ভালো ও কিছু মন্দ দিক রয়েছে।

এর ভালো দিকগুলো কী কী?

প্রথমত, মায়ের বুকের কাছে ঘুমোনোর সময় বাচ্চারা নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত বোধ করে, আর সহজে ঘুমিয়েও পড়ে। ব্রেস্টফীডিংয়ের সময় শিশুরে মায়ের মমতা ভরা স্পর্শ অনুভব করতে পারে এবং এই স্নেহ-স্পর্শে শিশু নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারে। এ’তে মা এবং সন্তানের সম্পর্ক আরও নিবিড় হয়ে ওঠে। মায়ের এই স্পর্শ শিশুর ঘুমের জন্য আদর্শ।

দ্বিতীয়ত,  বাচ্চাদের মেজাজ ঠিকঠাক না থাকলে বা তারা খিটখিটে হয়ে উঠলে, তারা অনেক সময় ব্রেস্টমিল্ক খোঁজে। ব্রেস্টমিল্ক বাচ্চাদের শান্ত করে আর তাদের খিটখিটে মেজাজকে ঠাণ্ডা করতে সাহায্য করে। এ’তে তাদের ঘুম পাড়ানোয় সুবিধে হয়। বিশেষত দুরন্ত বাচ্চাদের ঘুম পাড়ানোর জন্য ব্রেস্টফীডিং বেশ কার্যকরী। যে মায়েরা ব্রেস্টফীডিং বন্ধ করেছেন তারা সকলেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্বীকার করবেন যে বাচ্চাদের জেদ সামাল দিতে ব্রেস্টফীডিং একটা অত্যন্ত কার্যকরী পদ্ধতি।  

তাছাড়া ব্রেস্টমিল্কে কোলেসিস্টোকাইনিন (cholecystokinin) বলে এক রকম হরমোন আছে যা বাচ্চা এবং মা দু’জনকেই ঘুম পাড়াতে সাহায্য করে। এ বাদে  ব্রেস্টমিল্কে রয়েছে ট্রাইটফ্যান (tryptophan); এক ধরণের ঘুম পাড়ানি আম্যাইনো অ্যাসিড। রাতের দিকের ব্রেস্টমিল্কে থাকে এমন সব আম্যাইনো অ্যাসিড যা সেরোটোনিন সিন্থেসিসে (serotonin synthesis) সাহায্য করে; সে’টাও বাচ্চাকে ঘুম পাড়াতে সাহায্য করে। সব চেয়ে বড় কথা, পুষ্টিগত দিক দিয়েও ব্রেস্টমিল্ক হচ্ছে শিশুর জন্য সবচেয়ে উপকারী খাবার।

আর কখনও কখনও রাতের দিকে ব্রেস্টফীড করানোটাই আপনার শিশুর জন্য সবচেয়ে উপকারী হতে পারে। বাচ্চাদের বয়স যত বাড়ে তত তারা ব্রেস্টফীডিংয়ের সময় অমনোযোগী আর ছটফটে হয়ে ওঠে। এর ফলে ওদের ব্রেস্টমিল্ক খাওয়ার পরিমাণ কমে যায় আর তার জন্য ওদের মধ্যে পুষ্টির অভাব দেখা দিতে পারে।  রাত্রের দিকে বরং বাচ্চারা ক্লান্তির জন্য শান্ত হয়ে পড়ে আর এই সময় ওদের ব্রেস্টমিল্ক দিলে গোটা দিনের পুষ্টির অভাব পূরণ করা যেতে পারে।

কিন্তু এর খারাপ দিকগুলো কী কী?

ব্রেস্টমিল্ক খাইয়ে বাচ্চাদের ঘুম পাড়ানোর সবচেয়ে খারাপ দিক হচ্ছে ওদের স্বাভাবিক ঘুমের নিয়মে ব্যাঘাত ঘটা। এই ভাবে ঘুম পাড়ানোর ফলে আপনার শিশু মনে মনে ঘুমের সঙ্গে ব্রেস্টমিল্ক খাওয়ার সোজাসুজি সম্পর্ক আছে বলে ধরে নেয়। আর শিশু একবার তেমন ভাবে ভাবতে শুরু করলেই তার ঘুমের নিয়মে ঘটে যেতে পারে গণ্ডগোল; তখন সে কিছুতেই আর নিজে থেকে ঘুমোতে চাইবে না। তবে এ নিয়ে বেশি দুশ্চিন্তার কিছু নেই, বাচ্চা সঠিক বয়সে এলে সব কিছু আপনা থেকেই ঠিক হয়ে যাবে।

কিন্তু বাচ্চার ঘুমোনোর সময় ব্রেস্টমিল্ক খাওয়ার অভ্যাস যদি কিছুতেই না কাটতে চায় তাহলে আপনাকেই ঘুমের সময় ব্রেস্ট ফীডিং বন্ধ করতে হবে। তবে ব্যাপারটা সহজ নাও হতে পারে, কারণ অভ্যাসের বশবর্তী হয়ে বাচ্চারা রোজই ঘুমোনোর সময় জেদ ধরতে পারে ব্রেস্টমিল্কের জন্য। আপনাকে ধৈর্য ধরে ওকে এই অভ্যাসের থেকে বের করে আনতে।

আর বাচ্চাকে নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম পাড়ানোর অভ্যাস করাতে পারলেই ওর ঘুমের আগে ব্রেস্টমিল্ক খাওয়ার নেশাও কমে আসবে। রাতের একটা নির্দিষ্ট সময়ে; প্রয়োজনে গরম জলে স্নান করিয়ে, ঘুম পাড়ানি গান গেয়ে, ঘরের আলো কমিয়ে বাচ্চার ঘুমের পরিবেশ তৈরি করুন; এ’তে ওকে ঘুম পাড়ানো সহজ হবে।

আর হ্যাঁ, বাচ্চাকে ব্রেস্টমিল্ক খাইয়ে ঘুম পাড়ানো মানে আপনার আর বাচ্চার দু’জনেরই ঘুমের নিয়মে ব্যাঘাত ঘটা। এ’তে আপনার ক্লান্তি বাড়বে আর সবচেয়ে বড় কথা ঘুম ভাঙা মাত্রই আপনাকে বাচ্চার ঘ্যানঘ্যান শুনতে হতে পারে। তবে বাচ্চাকে কে ঘুমের মাঝে ব্রেস্টফীড করাতে যদি আপনার কোনও অসুবিধে না হয়, তাহলে আপনি নিশ্চিন্তে চালিয়ে যেতে পারেন।

Translated by Tanmay

loader