আপনি কি আপনার শিশুকে এই জরুরী ‘সুপারফুড’গুলো খাওয়াচ্ছেন?

খাওয়াদাওয়া আমাদের সকলের জন্যই জরুরী, এ’টা কোনও নতুন কথা নয়। তবে শিশুদের ক্ষেত্রে পুষ্টির প্রয়োজন আরও বহুগুণ বেশি। এ’টা নিয়ে অবশ্যই কোনও দ্বিমত নেই যে শিশুদের জন্য পুষ্টির সব চেয়ে বড় উৎস হল ব্রেস্টমিল্ক। কিন্তু প্রথম কয়েক মাসের পর শিশুদের পুষ্টির প্রয়োজন বৃদ্ধি পায় এবং এই সময়ে শিশুদের ব্রেস্টমিল্কের বাইরে অন্যান্য খাবারে অভ্যস্ত হতে হয়; ওদের এ’সময়ের প্রয়োজনগুলো সঠিক ভাবে বোঝাটা অত্যন্ত জরুরী। বড়দের জন্য বিভিন্ন রকম সুপারফুডের কথা আজকাল প্রায়শই শোনা যায়। ঠিক তেমনই শিশুদেরও প্রয়োজন সে’রকম ‘সুপারফুড’।

সুপারফুড কী?

সুপারফুড হচ্ছে সেই সব খাবার যা শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় যাবতীয় পুষ্টিতে ভরপুর। এতে থাকে সব রকম জরুরী ভিটামিন, মিনারেল, অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট আর থাকে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার যাতে তা শিশুদের জন্য সহজপাচ্য হয়।

 অনেক সময় ডাক্তাররা শিশুর ছয় মাস বয়স থেকে তাকে সলিড ফুড দিতে বলেন আর এ সময়টাই মায়দের মনে প্রশ্ন জাগে যে শিশুদের জন্য সঠিক আহার কী হতে পারে যা’তে ওর সমস্ত পুষ্টির চাহিদা পূরণ করা যায়। আমাদের এই লিস্টে যে ক’টা সুপারফুড উল্লেখ করা হয়েছে, তা’তে আপনার শিশুর সমস্ত পুষ্টির চাহিদা সহজেই মিটিয়ে নেওয়া সম্ভব। অতএব বয়স অনুযায়ী  আটখানা সুপারফুড সাজিয়ে দেওয়া হল আপনার সন্তানের জন্য: 

১। কলা:

নিজের মা বা দিদিমাকে জিজ্ঞেস করলেই বুঝতে পারবেন যে কলা প্রতিটি প্রজন্মের বাবা মায়ের কাছেই তাঁদের সন্তানের আহারের জরুরী অংশ। কলায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার, ম্যাগনেসিয়াম, পটাসিয়াম, ভিটামিন বি-সিক্স, ক্যালসিয়াম এবং আয়রন।  কলা বাড়ন্ত বাচ্চাদের অফুরন্ত শক্তি যোগান দিতে পারে এবং সবচেয়ে বড় কথা এ’টা গোটা বছর সহজলভ্য। কলা চটকে পিউরি করে বা মিল্কশেকের সঙ্গে খাওয়ানো যেতে পারে, যে শিশুরা একটু বড় তাদের গোটাও খাওয়ানো যেতে পারে।

ব্যানানা পিউরির রেসীপিঃ কলার খোসা ছাড়িয়ে মিক্সিতে বা হাতে ভালো করে চটকে নিন। এক চামচ দই মিশিয়ে নিলে পিউরি আরও সুস্বাদু হবে। 

কোন বয়স থেকে খাওয়াবেন ঃ চার মাস বয়স থেকে। 

২। রাঙা আলু: 

শিশুদের খাদ্য হিসেবে রাঙাআলুর (মিষ্টি আলু) কোনও তুলনা হয় না। এ’তে রয়েছে যথেষ্ট পরিমাণে বিটা-ক্যারোটিন, ক্যালসিয়াম আর পটাসিয়াম। তা ছাড়া মিঠে আলু কন্সটিপেশনের মোকাবিলা করতেও অত্যন্ত কার্যকরী। 

রেসীপিঃ রাঙাআলুকে করে কুকারে সেদ্ধ করে, খোসা ছাড়িয়ে, ভালো করে মেখে নিন। হালকা আঁচে রান্না করার সময় অল্প গুড়ও মিশিয়ে নিতে পারেন। 

কোন বয়স থেকে খাওয়াবেন ঃ চার মাস বয়স থেকে। 

৩। আভাকাডোঃ

ব্রেস্টমিল্কের পর আভাকাডোই আপনার শিশুর জন্য আদর্শ প্রথম খাবার হতে পারে। আভাকাডোতে রয়েছে জরুরী ফ্যাট যা মগজের জন্য অত্যন্ত উপকারী। আর এই ফল মাখনের মত মোলায়েম কাজেই আপনার শিশুসন্তানকে এ’টা খাওয়াতে বিশেষ বেগ পেতে হবে না। 

রেসীপিঃ খোসা আর বীজ ছাড়িয়ে ভালো করে চটকে নিন। আপনার শিশুর গুয়াকামোল (Guacamole)তৈরি।

কোন বয়স থেকে খাওয়াবেন ঃ চার মাস বয়স থেকে। 

৪। আলুবোখারাঃ

প্রথম যখন শিশুরা ব্রেস্টমিল্কের বাইরে অন্যান্য খাবার খেতে শুরু করে, তখন অনেক সময় তারা পেটের গোলমালে ভোগে। আলুবোখারা পেটের যাবতীয় সমস্যা আর কন্সটিপেশন মোকাবিলার জন্য আদর্শ। এ’তে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার আর অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট যাতে পাচন ক্ষমতা আরও মজবুত হয়ে ওঠে আর কন্সটিপেশন কমে আসে। 

রেসীপিঃ আপেল আর আলুবোখারা এক সঙ্গে সেদ্ধ করে তারপর সে’টাকে পিষে মসৃণ পিউরি তৈরি করুন।  

কোন বয়স থেকে খাওয়াবেন ঃ ছয় থেকে আট মাস বয়স থেকে। 

৫। নারকোল:

শিশুদের খাদ্যে নারকোলের গুরুত্বকে অনেকেই অনুধাবন করতে পারেন না কিন্তু নারকোল শিশুদের জন্য অত্যন্ত উপকারী। নারকোলের রয়েছে প্রচুর পরিমাণে মিডিয়াম চেন ফ্যাটি অ্যাসিড যা আপনার শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে মজবুত করে তোলে আর হজমেও সাহায্য করে। আর মায়েদের জন্য সবচেয়ে বড় সুবিধে হল নারকোল দিয়ে শিশুর জন্য হরেক রকমের খাবার তৈরি করা সম্ভব।

রেসীপিঃ আপনার শিশুর খাওয়ার ভাত রান্না করার সময় অল্প নারকোলের দুধ মিশিয়ে তার স্বাদ বাড়িয়ে তুলুন। অথবা রোজ ওকে ডাবের জল খাওয়ানো। ক্ষীর বা পায়েস করে অথবা অন্যান্য ফলের সঙ্গে মিশিয়েও ওকে নারকোল খাওয়াতে পারেন। শিশুরা একটু বড় হলে ওরা নারকোল চিবিয়েও খেতে পারে।   

কোন বয়স থেকে খাওয়াবেন ঃ ছয় থেকে আট মাস বয়স থেকে। 

৬। দই:

দইতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম আর ভিটামিন ডি যাতে শিশুর হাড় হয় আরও মজবুত। দইতে রয়েছে উপকারী ব্যাকটেরিয়া যা পেটের জন্য ভালো আর রোগপ্রতিরোধের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। 

রেসীপিঃ সোজাসুজি দই খাওয়ানো যেতে পারে অথবা ফলের পিউরি বা মিল্কশেকে মিশিয়েও খাওয়ানো যেতে পারে। তবে দইয়ে চিনি মেশাবেন না। 

কোন বয়স থেকে খাওয়াবেন ঃ চার থেকে ছয় মাস বয়স থেকে। 

৭। ব্রকোলিঃ 

ব্রকোলি মগজের জন্য খুবই উপকারী, বড় ছোট সবার জন্য। এ’তে রয়েছে ভিটামিন সি, বিটা-ক্যারোটিন, ফলিক অ্যাসিড, আয়রন, পটাসিয়াম আর ফাইবার। মনে রাখবেন ব্রকোলিকে জলে সেদ্ধ করলে তার ভিটামিন কমে আসে। কাজেই ব্রকোলিকে ভাপিয়ে তারপর রান্না করুন।

রেসীপিঃ কুকারে ব্রকোলি ভাপিয়ে নিয়ে ভালো করে চটকে একটা পিউরি তৈরি করুন। এরপর অল্প নুন আর মরিচ মিশিয়ে নিন স্বাদ যোগ করতে। যদি আপনার শিশুর এ’টা খেতে ভালো না লাগে তবে এর মধ্যে রাঙাআলুর মত কিছু মিষ্টি সবজি মিশিয়ে দিতে পারেন। ব্রকোলির স্যুপও শিশুদের জন্য বেশ উপকারী। 

কোন বয়স থেকে খাওয়াবেন ঃ আট থেকে দশ মাস বয়স থেকে। 

৮। মুসুরি ডাল:

শিশুকে মুসুরি ডাল খাওয়ান না এমন মায়ের দেখা আমাদের দেশে মিলবে বলে মনে হয় না। শিশুদের বাড়ন্ত বয়সে সব চেয়ে দরকারি হচ্ছে প্রোটিন আর মুসুরি ডালে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন। এ ছাড়া মুসুরি ডালে রয়েছে প্রচুর ফাইবার যা হজমে সাহায্য করে।  মুসুরি ডালকে ভাতের সঙ্গে মেখে বা খিচুড়ি বানিয়ে খাওয়ানো যেতে পারে; এমন কি মুসুরি ডালের স্যুপও চলতে পারে। 

রেসীপিঃ প্রেশার কুকারে মুসুরি ডাল ভালো করে সেদ্ধ করুন যতক্ষণ না তা ভালো ভাবে গলে যাচ্ছে। এর পর সেই সেদ্ধ মুসুরি ডালের জল নিয়ে আপনার শিশুকে স্যুপের মত খাওয়ান বা ভাতে চটকে খাইয়ে দিন। 

কোন বয়স থেকে খাওয়াবেন ঃ ছয় থেকে আট মাস বয়স থেকে। 

সাবধান বার্তা: এই লিস্টের সমস্ত খাবারই শিশুর জন্য নিরাপদ এবং সহজে হজম হয়। তবু যদি কোনও খাবারের ব্যাপারে আপনার কোনও চিন্তা থাকে তাহলে তাহলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

Translated by Tanmay Mukherjee

loader