এন্ডেমেট্রিওসিসের যে পাঁচটা চিহ্ন সম্বন্ধে প্রত্যেক মহিলার সচেতন থাকা উচিৎ।

এমন নারীর হদিস খুঁজে পাওয়া মুশকিল যার পিরিয়ডের সময় কোনও সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় না । মাসের ওই তিন চার দিনের কথা ভেবে আমরা সকলেই একটু হলেও চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ি। পিরিয়ডের সময়কার শারীরিক আর মানসিক সমস্যাগুলো খুব একটা হেলাফেলার বিষয়ও নয়। তবে পিরিয়ডের সময় আপনার যাবতীয় সমস্যা যদি শুধু ত্বকের সমস্যা, তলপেটের ব্যথা এবং মেজাজ ও মনের গড়বড়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তা’হলে বলতে হয় যে আপনি অত্যন্ত ভাগ্যবান। অবাক লাগছে? বিশ্বাস করুন ব্যাপারটা সত্যি।

আমি তখন ক্লাস এইটে পড়ি। আমাদের ক্লাসে একটা নতুন মেয়ে আসে সে বছর, ওই বয়সের আর পাঁচটা মেয়ের মতই উচ্ছল আর চনমনে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে মেয়েটি প্রতি মাসে সপ্তাহ খানেকের জন্য গায়েব হয়ে যেত। ওর এই নিয়মিত অনুপস্থিতি সবার নজরে পড়ত আর আমরা ভাবতাম মেয়েটা প্রতি মাসে এত লম্বা ছুটি নিয়ে যায় কোথায়? আমরা ওই রকম দেদার ছুটি নিতে পারতাম না বলে মনে অল্প ঈর্ষাও জন্মেছিল।

ক্লাস নাইনে গিয়ে সেই মেয়েটি সঙ্গে বন্ধুত্ব জমে ওঠে এবং তখন জানতে পারি ওর প্রতি মাসে লম্বা ছুটি নেওয়ার কারণ। পিরিয়ডের সময় ওর রক্তক্ষরণ কিছুতেই থামতে চাইত না আর বিপত্তি সে’খানেই। পিরিয়ড কখন শুরু হবে সে’টা সে আগে থেকে বুঝতে পারত না আর পিরিয়ড শুরু হলেই তাকে অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করতে হত; প্রায়শইই ফ্যাকাসে হয়ে পড়ত সে। এ’জন্যেই মাসের ওই সময়টা তাকে স্কুল কামাই করতে হত। তখন আমরাও বেশ ছোট, কাজেই সে সময় আমরা কিছুতেই ঠাহর করতে পারতাম না পিরিয়ড এত যন্ত্রণাদায়ক কী ভাবে হতে পারে। বেশ কিছুদিন পরে আমরা আদত কারণটা জানতে পেরেছিলাম; মেয়েটা এন্ডোমেট্রিওসিসে ভুগছিল। অবশ্য এই খটমট নামের রোগটা যে আসলে কী, সে’টা আমরা তখন বুঝিনি। এবং আমি নিশ্চিত আমাদের স্কুলের শিক্ষিকারাও ব্যাপারটা সঠিক ভাবে বুঝে উঠতে পারেননি কারণ তাঁরা ব্যাপারটা বুঝলে আমার সেই বান্ধবীটিকে সহমর্মিতার অভাবে ভুগতে হত না।

এন্ডোমেট্রিওসিস আসলে কী? এন্ডোমেট্রিওসিসে হল ইউট্রাসের এন্ডোমেট্রিয়াল কোষের (অর্থাৎ যে কোষ ইউট্রাসের ভিতরে থাকা উচিৎ) অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং এ ক্ষেত্রে সেই বৃদ্ধিটা ঘটে ইউট্রাসের বাইরে। গর্ভধারণে অক্ষমতার সঙ্গে যে মহিলারা যুঝতে হচ্ছে, অনেক সময় তাঁদের এই সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। তবে বলে রাখা দরকার যে এন্ডোমেট্রিওসিস থাকা মানেই গর্ভধারণে অক্ষমতা নয়।

অনেক সময় আমরা পিরিয়ডের সময় অনুভূত যন্ত্রণার সঙ্গে এন্ডোমেট্রিওসিসকে গুলিয়ে ফেলি এবং সে কারণে সঠিক ডায়গোনিসিস বিলম্বিত হয়। এন্ডোমেট্রিওসিসের ক্ষেত্রে অনেক বহুবিধ সমস্যা দেখা দেয় যেগুলোকে চিনতে পারাটা জরুরী যেমন তলপেটে অসহ্য ব্যথা, যৌনমিলনের সময় যন্ত্রণা, গর্ভধারণে অক্ষমতা বা মলমূত্রাদি ত্যাগের সময় ব্যথা।

১। পিরিয়ডের সময় অত্যধিক ক্ষরণ।

এন্ডোমেট্রিওসিস যাঁদের আছে, অনেক ক্ষেত্রেই তাঁদের পিরিয়ডের সময় অস্বাভাবিক রকম বেশি ক্ষরণ হয় এবং অনেক সময় দেখা যায় চাপ বাঁধা রক্ত। পিরিয়ডের সময় ইউট্রাসের বাইরের যে এন্ডোমেট্রিয়াল টিস্যু রয়েছে, তার সঙ্গে মিশে যায় বিভিন্ন মেন্সট্রুয়াল হরোমন এবং এর ফলেই ক্ষরণ হয় বেশি। এন্ডোমেট্রিয়াল টিস্যু যত বাড়বে, পিরিয়ডে রক্তক্ষরণও ততই বৃদ্ধি পাবে।

২। তলপেটের অসহ্য ব্যথা, বিশেষত পিরিয়ডের সময়।

এন্ডোমেট্রিওসিসের সব চেয়ে স্পষ্ট চিহ্ন হচ্ছে তলপেটে অসহ্য ব্যথা, বিশেষত পিরিয়ডের সময়। অনেকের ক্ষেত্রে ব্যথাটা একটানা থাকে তবে পিরিয়ডের আগে বা পরে এ’টা অত্যন্ত কষ্টদায়ক হয়ে ওঠে। আসলে অনেক সময় এন্ডোমেট্রিয়াল টিস্যু থেকে রক্তক্ষরণ শুরু হয় কিন্তু সে’টা বেরোবার পথ খুঁজে পায় না; সে ক্ষেত্রে ফোলা আর যন্ত্রণা দুইই থাকতে পারে। একটা কামড়ে ধরা ব্যথা এ ক্ষেত্রে অনুভূত হয় তলপেটে আর পিঠে; খানিকটা পিরিয়ডের সময়কার ব্যথা মনে হলেও এ ক্ষেত্রে যন্ত্রণার পরিমাণ অনেক বেশি হয়।

৩। গ্যাস্ট্রোইন্টেস্টিনাল ব্যথা।

এন্ডোমেট্রিওসিসের অনেক সময় কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়রিয়া, অন্ত্রের ব্যথা বা মলত্যাগের সময় যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই উপসর্গগুলো গ্যাস্ট্রোইন্টেস্টিনাল সমস্যা বা হজমশক্তির গোলযোগ বিষয়ক বলে গুলিয়ে ফেলার সুযোগ রয়েছে। নিজের হজম ক্ষমতার উন্নতির সম্বন্ধে সচেতন হলে এন্ডোমেট্রিওসিসের ব্যথা সামান্য কমতে পারে কিন্তু যন্ত্রণা একদম উবে যাবে না।

৪। যৌনমিলনের সময় যন্ত্রণা।

যৌনমিলনের সময় যন্ত্রণা এন্ডোমেট্রিওসিসের আর একটা চিহ্ন। এই যন্ত্রণা যৌনমিলনের সময় হতে পারে বা মিলনের পরে। কিছু ক্ষেত্রে যৌনমিলনের পরের দিনও এই ব্যথার রেশ রয়ে যায়। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হচ্ছে যে অনেক ক্ষেত্রে মহিলারা এই যন্ত্রণার কথা খুলে বলতেও পারেন না। পিরিয়ডে সময় বা পিরিয়ডের ঠিক আগে এই যন্ত্রণা আরও বেড়ে যেতে পারে।

৫। গর্ভধারণে অক্ষমতা।   

এন্ডোমেট্রিওসিসে আক্রান্ত মহিলাদের প্রায় ৫০% শতাংশ গর্ভধারণে অক্ষম। অনেক ক্ষেত্রে গর্ভ ধারণের অক্ষমতাই এন্ডোমেট্রিওসিসের একমাত্র চিহ্ন হয়ে দেখা দেয়। সেই কারণেই অনেক মহিলা নিজেদের এন্ডোমেট্রিওসিসের কথা জানতেই পারেন না যতক্ষণ না তাঁরা গর্ভধারণ করতে গিয়ে বার বার ব্যর্থ হয়ে ফার্টিলিটি ক্লিনিকের শরণাপন্ন হন।

ওপরের আলোচিত অভিজ্ঞতাগুলোর সম্মুখীন যদি আপনাকে হতে হয় তবে ডাক্তারের কাছে যেতে দেরী করবেন না কারণ এই সমস্যার সমাধান আছে। আর সঠিক সময়ে সঠিক সমাধান খুঁজে পেয়ে আমার পরিচিত অনেকে ব্যথার কবল থেকে অনেকটা মুক্ত হয়ে সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পেরেছেন। এ ক্ষেত্রে সমাধানগুলো কী কী হতে পারে?

১। যন্ত্রণার ওষুধ খাওয়া: আপনার শরীরের অবস্থা বুঝে ডাক্তার আপনাকে সঠিক ওষুধ বাতলে দিতে পারেন। অন্যান্য টোটকাও রয়েছে যার ওপর ভরসা করে আপনার যন্ত্রণা অনেকটা কমে যেতে পারে।

২। হরোমন থেরাপি: পিরিয়ডের সময়ে হরমোনের অস্বাভাবিক ওঠা নামার জন্যেই আপনার যন্ত্রণা বা অন্যান্য উপসর্গগুলো আরও বেদনাদায়ক হতে পারে। আজকাল অনেক রকম হরোমন থেরাপি রয়েছে যা’তে মিলতে পারে সুফল।

৩। সার্জারি: গর্ভধারণের অক্ষমতার মোকাবিলা করতে চাইলে অনেক ক্ষেত্রে অপারেশনের দরকার হতে পারে। তবে সার্জারির দরকার আদৌ আছে কিনা সে’টা বুঝতে খোলাখুলি নিজের ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।

Translated by Tanmay Mukherjee

loader