শিশুদের নিয়মিত ব্যবহারের ৪টে সরঞ্জাম যা কখনই কেনা উচিৎ না

বাবা মা হিসেবে আমরা সব সময় চাইব ছেলেমেয়ের জন্য সেরা জিনিসটা কিনে দিতে যাত ওরা আরও একটু ভালো থাকে। সবচেয়ে ভালো ডাইপারটা, সবচেয়ে দামী জামাকাপড় বা এমন সব খেলনা যেগুলো আমাদের মতে শিশুদের বেড়ে ওঠার আদর্শ সঙ্গী হতে পারে; এ’সবকিছুর দিকে আমাদের সবসময় নজর রয়েছে। কিন্তু কখনও নিজের অজান্তেই আমরা এমন সব বেবি প্রোডাক্টের দিকে ঝুঁকে পড়ি যেগুলো আমাদের ছেলেমেয়ের বেড়ে উঠতে সাহায্য করার বদলে তাদের আরও পিছিয়ে দেয়। দৈনিক ব্যবহারের এমন বেশ কিছু বেবি প্রডাক্ট রয়েছে যা আদতে আপনার শিশুর জন্যে ক্ষতিকারক।

ওয়াকার

আপনি হয়ত ভেবেছিলেন যে ওয়াকার আপনার শিশুর জন্য একটা দারুণ উপহার কারণ এ’তে সে নিশ্চিন্তে যে’খানে খুশি চলে যেতে পারে নিজের ইচ্ছেমত। আপনার ভাবনার অবশ্য কোনও দোষ নেই কিন্তু পৃথিবী জুড়ে পিডিয়াট্রিশিয়ানরা কিন্তু অন্য কথা বলছেন। আপনি কি জানেন যে কানাডায় সেই ২০০৪ থেকেই ওয়াকার নিষিদ্ধ? ওয়াকারে আপনার শিশুর নিজে থেকে দাঁড়াতে পারার সহজাত প্রবৃত্তিগুলোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।আর একটা চিন্তার ব্যাপার হলো এই যে ওয়াকারে ভর দিয়ে একজন শিশু বিপদজনক জিনিসপত্রকে নিজের আওতায় এনে ফেলতে পারে। আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে যে ওয়াকারে নির্ভরশীল হওয়ার ফলে শিশু নিজের পা সম্পূর্ণ ভাবে ব্যবহার করতে শিখছে না, সে নিজের ব্রেনকেও সঠিক ভাবে ব্যবহার করছে না।

আপনার কী করা উচিৎ?

শিশুকে নিজের মত খেলে বেড়াতে দিন। হয়ত সে বারবার পড়বে, হোঁচট খাবে; কিন্তু আপনি দেখে অবাক হবেন যে ওদের সহজাত বিচারবুদ্ধি ব্যবহার করে ওরা কত তাড়াতাড়ি কত কিছু শিখতে পারে।  হয়তো ও নিজে থেকে ওয়াকারের গতিতে ছুটে বেড়াতে পারবে না কিন্তু তা’তে বিশেষ চিন্তার কিছু নেই। একবার যখন সে হাঁটতে শিখবে, তখন তাকে রোখা মুশকিল।

সিপি কাপ

বেশির ভাগ বাবা মা সিপি কাপের দিকে ঝোঁকেন দু’টো কারণে;

এক, এ’তে শিশু জল খাওয়ার সময় জল চলকে পড়ে না। দুই, এ’টা বোতল থেকে জল খাবার মতই সহজ।

প্রথমেই জেনে রাখুন যে স্তন্যপান আর দুধের বোতল থেকে খাওয়ায় কোনও অসুবিধে নেই কারণ সে’খানে নিপ্‌ল নিজে থেকে আকার পালটে নেয় কিন্তু প্লাস্টিকের সিপি কাপে সে উপায় নেই। সে জন্যেই সিপি কাপ মুখের মধ্যে অনভিপ্রেত পরিবর্তন ঘটাতে পারে, এমনকি ভবিষ্যতে দাঁতের  সমস্যা বা কথা বলতে অসুবিধা হওয়াও আশ্চর্যজনক নয়।

আপনার কী করা উচিৎ?

সাধারণ গেলাসই ব্যবহার করুন। গেলাস বেশি বড় ঠেকলে বরং কাপ ব্যবহার করুন। হ্যাঁ, তা’তে জল চলকে ছড়িয়ে পড়তে পারে বা হুড়মুড় করে জল খেতে গিয়ে গলায় জল আটকে গলা বেয়ে কাশি উঠে আসাও বিচিত্র নয় (ভুললে চলবে না যে শিশুটি এখনও গেলাস চুমুক দিয়ে জল খেতে শেখেনি) কিন্তু ধীরে ধীরে সে ব্যাপারটা শিখে নিতে পারবেই। এ’তে শিশুর মোটর স্কিল্‌সও (গেলাস দু’হাতে ধরতে পারা) উন্নত হবে।

প্যাসিফায়ার

বিদেশে প্যাসিফায়ারের প্রচলন অনেক বেশি। প্যাসিফায়ারে SIDS (Sudden Infant Death Syndrome বা আচমকা শিশু মৃত্যু)কমে আসে এমন ধারণাও প্রচলিত। আজকাল অবশ্য আমাদের দেশীয় বেবিস্টোরগুলোতেও প্যাসিফায়ারের ছড়াছড়ি। অনেক বাবা-মা প্যাসিফায়ারের ব্যবহার শুরু করেন শিশুদের বুড়ো আঙুল চোষা বন্ধ করতে। প্যাসিফায়ার শিশুদের নিশ্চিন্দিতেও রাখে বটে। তাছাড়া বিমান অবতরণের সময় শিশুদের আচমকা অস্বস্তি থেকে রেহাই দিতেও প্যাসিফায়ার ব্যবহার করা হয়। কিন্তু কিছু বিশেষজ্ঞরা সাবধান করে দিয়েছেন যে প্যাসিফায়ার ব্যবহারে ভবিষ্যতে দাঁতের ব্যারাম দেখা দিতেই পারে। কিছু ক্ষেত্রে, প্যাসিফায়ার ব্যবহারে কানের সংক্রমণও হতে পারে।

আপনার কী করা উচিৎ?

ব্যবহার যতটা সম্ভব কমিয়ে দিন। আপনার শিশু ক্রমশ প্যাসিফায়ারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারে, কাজেই ব্যবহার যতটা সম্ভব কম করলে তার উপকারই হবে। যদি আপনি বিমানে প্যাসিফায়ার ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে থাকেন, তাহলে একবার শিশুর মুখের এক টুকরো গুড় দিয়ে দেখুন কারণ ঢোক গিললে কানের অস্বস্তি কমে আসে।

কথা বলা খেলনা

এ’টা বোধ হয় আপনি ভাবতে পারেননি , তাই না? অনেক সময় বাবা মায়েরা ঝকমকে, দামী কথা বলা খেলনা কিনে ফেলেন ছোটদের ভালো লাগবে ভেবে। এবং শিশুদেরও যে সে’সব জলুসপূর্ণ খেলনাপাতি পছন্দ হবেই তা নিয়েও কোনও সন্দেহ নেই। শিশুরা রংচং আর জিনিসপত্রের নড়াচড়া দেখে মজা পায় (এ’বার বুঝলেন তো, শিশুরা মোবাইল ফোন এত ভালোবাসে কেন?)।আমরা ভাবি যে এই কথা বলা খেলনাগুলো নিয়ে খেললে শিশুরা তাড়াতাড়ি কথা বলতে শিখবে কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় বিশেষজ্ঞরা ব্যাপারটা উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁদের মত হচ্ছে যে এ’সব শব্দবাজ খেলনা উলটে কথা বলতে শেখার পথে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। আসলে অসুবিধে হচ্ছে এই সব খেলনায় কথাবার্তা ঘটে একতরফা। শিশুরা যে কোনও কিছু শিখতে আরম্ভ করে সাধারণত নকল করার চেষ্টা করতে গিয়ে। আপনি হয়তো খেয়াল করেছেন যে আপনি যখন কথা বলছেন, তখন আপনার শিশুটি আপনার ঠোঁটের নড়াচড়া মন দিয়ে দেখে নিজের ঠোঁট নেড়ে চলেছে। ইলেক্ট্রনিক কথা বলা যাবতীয় খেলনায় কিন্তু এই সুবিধেটা নেই। আর তাছাড়া এই কথা বলা খেলনাগুলো কল্পনাশক্তি বা সৃজনশীলতা উন্মেষে আদৌ কোনও সাহায্য করে না, সে’ সমস্যাটাও যথেষ্ট গভীর।

আপনি কী করবেন?

এ’সব দামী খেলনা মাঝেমধ্যে অবিশ্যি কিনতেই পারেন কিন্তু নিয়মিত নয়। শিশুটিকে সাধারণ খেলনাগুলোর মধ্যেই মজে থাকতে দিন। ছোটরা একটা সামান্য বাক্স বা ছোট চামচ নিয়ে খেলে আনন্দে আটখানা হতে পারে, সে’টা নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন? চেষ্টা করুন তেমনি সহজ ভাবেই তাকে রাখতে। আর সব চেয়ে বড় কথা, নিজের শিশুকন্যা বা পুত্রটির সঙ্গে যতটা সম্ভব কথা বলুন, এরচেয়ে ভালো দরের প্রাণখোলা আড্ডা আর কিছু হতে পারে না।

Translated by Tanmay Mukherjee

loader